মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?
ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।
ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়)
অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)
অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~
এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ?
কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি।
তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে।
কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~
গালির সংজ্ঞা কী?
"গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করা খুব কঠিন।"
গালি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. এমা বার্ন এর মতে~
গালি হচ্ছে এমন এক ধরনের ভাষা যা আমরা চমকিত বা স্তম্ভিত বা উৎফুল্ল হলে ব্যবহার করি, অথবা ব্যবহার করি মজা করার জন্য বা কারো প্রতি আক্রমণাত্মক হবার জন্য।
তিনি আরও বলছেন, প্রকৃতপক্ষে কোন শব্দটা যে একটা গালি হয়ে উঠবে ? তা উক্ত সংস্কৃতির বা সমাজের বা ভাষাভাষীর সবাই মিলেই ঠিক করে।
তবে "গালি সাধারণত সেই বিশেষ সমাজের বা সংস্কৃতির বা ভাষাভাষীর কোনো একটা নিষিদ্ধ বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।"
ড. বার্ন বলছেন, "গালি হচ্ছে সেই ধরনের ভাষা - যা আপনি কিছু কিছু পরিস্থিতিতে কখনোই ব্যবহার করবেন না, যেমন কোন চাকরির ইন্টারভিউয়ের সময়, বা আপনার প্রেমিক বা প্রেমিকার বাবা-মায়ের সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময়।"
"আমার ক্ষেত্রে গালিটা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মুখ দিয়ে বের হয়ে আসে, কিছু ভাবার আগেই যেন ব্যাপারটা ঘটে যায়। আর গালি দেবার পরপরই আমি ভালো বোধ করি," ।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে~
"দেখা গেছে, কারো হয়তো মস্তিষ্কের বাম দিকের অংশ কেটে বাদ দেয়া হয়েছে, বা স্ট্রোকের মত কোন কারণে মস্তিষ্কের বাম দিক গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে - তার ফলে সে হয়তো কথা বলার ক্ষমতা বা ভাষার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে, কিন্তু তখনো সে গালি দিতে পারে।"
"গালি দেয়াটা আমাদের আবেগের সাথে এত গভীরভাবে সম্পর্কিত যে~ ওই শব্দগুলো উচ্চারণের জন্য যে মাংসপেশীর নড়াচড়ার দরকার হয়, তা একাধিক জায়গায় ধারণ করা থাকে। যাতে দরকার মতো ব্যবহারের জন্য 'ব্যাকআপ' থাকে।"
ড. রিচার্ড স্টিভেন্স, কীল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের সিনিয়র লেকচারার।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা "গালি ল্যাবরেটরি" আছে যেখানে তারা এ সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান।
সেখানে তারা প্রমাণ করেছেন যে~ যেকোন চরম পরিস্থিতিতে বা ব্যথা-যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষেত্রে গালি দেয়াটা সাময়িক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়।
একজন শ্রোতা যিনি বলেছিলেন "আমি সাধারণত গালি দিই না" - "কিন্তু কয়েকবছর আগে একটা দুর্ঘটনার পর তাকে একটা পর্বত থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তাতে উনার কাঁধের হাড়ের জোড়া খুলে গিয়েছিল, এবং উনাকে একটা স্লেজে করে নামাতে হয়েছিল। প্রতিটি ঝাঁকুনির সাথে প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছিলেন উনি, আর পর্বত থেকে নেমে আসার পুরো পথটাই তিনি সমানে গালি দিয়ে যাচ্ছিলেন। আর কোন কথায় কাজ হচ্ছিল না তার।"
বিভিন্ন ভাষায় গালাগালি:~
গবেষণায় জানা যায় যে, "স্প্যানিশ এবং রুশ ভাষা গালাগালির জন্য খুবই সৃষ্টিশীল ভাষা,"।
গালাগালির সংস্কৃতি এই ভাষাভাষীদের সাহিত্যের গভীরে প্রোথিত। আর, গালি দেয় না এমন একজন রাশিয়ান বা স্প্যানিশ লোক কল্পনা করাই দুষ্কর,"।
"ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষায় কিছু মজার গালাগালি আছে। ''কচ্ছপের ডিম'' চীনা ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত গালি। সাধারণত মা কচ্ছপের বহু প্রেমিক থাকে~ তাই চীনা ভাষায় কাউকে যদি ''কচ্ছপের ডিম'' বলা হয়, এর অর্থ হচ্ছে - তার বাবা কে তার কোন ঠিক নেই।
কাজেই দেখা যাচ্ছে যে গালির বিষয়বস্তু নানা দেশে নানা রকম হতে পারে, কিন্তু গালাগালিটা যে মানুষের সংস্কৃতির একটা বৈশ্বিক দিক - তা বেশ স্পষ্ট।
Comments
Post a Comment