Skip to main content

মোবাইলের আসক্তি বা নেশা বনাম বইয়ের নেশা বা বই পড়ার আসক্তি~

 বিজ্ঞানের বদৌলতে বলতে গেলে মোবাইল ফোন মানুষের যাপিত জীবনের অতিপ্রয়োজনীয় একটি অংশ হয়ে গেছে। অথচ মা-বাবা'র অসচেতনতা এবং বৈশ্বিক মহামারি করোনা এর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাসের পর মাস ধরে বন্ধ থাকার কারণে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের সেই মোবাইলে-ই সময় কাটানো আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।

আগে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডে ছাত্রছাত্রী, তরুণ-তরুণীদের মেধার বিকাশ ঘটত। এখন লাখ লাখ কম বয়সী ছেলেমেয়ের দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে মোবাইলে গেইম খেলে। হাট-মাঠ-ঘাট, রাস্তার মোড়, গলিপথ এমনকি বাসা-বাড়িতেও দেখা যায় নতুন প্রজন্মের ছেেলেমেয়েদের মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে, গেম খেলতে।

বর্তমানে প্রাথমিকের গন্ডি পার না হওয়া এক শ্রেণির শিশু থেকে শুরু করে উঠতি বয়সীদের হাতে হাতে  অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দেখা যাচ্ছে। ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় ইন্টারনেটভিত্তিক নানা গেমস নিয়ে মেতে থাকে কিশোরদের দল। ফোনে টাকা বাজি ধরে লুডু খেলে বলেও জানা গেছে।  

এছাড়াও ফোনসেট এবং ইন্টারনেট হাতের মুঠোয় থাকায়, সহজেই পর্নো ভিডিওসহ অশ্লীল ও অনৈতিক ভিডিও দেখার সুযোগ অনায়াসেই পেয়ে যাচ্ছে অপরিণত বয়সীরা। বাংলাদেশে খুব ছোট আকারের একটি জরিপে দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশ নিয়মিত পর্নোগ্রাফি দেখে থাকে। (সূত্র: প্রথম আলো) আর এসব শিশু-কিশোরই একটু বড় হলে জড়িয়ে যাচ্ছে নানা অপকর্মে। দলবেঁধে আড্ডা দেওয়া, মাদকদ্রব্য গ্রহণ, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করাসহ নানা অপরাধমূলক কাজে সম্পৃক্ত হচ্ছে তারা। এসব কাজকে স্মার্টনেসও মনে করে তারা।

 পরিবারের অসচেতনতার কারণেই কিশোররা বখাটে হয়ে যাচ্ছে। অপরিণত বয়সে মোবাইল ফোন ব্যবহারে বাধা না দেওয়ায় দিন দিন মোবাইল ব্যবহারে আসক্ত হয়ে পড়ছে তারা। লেখাপড়া থেকেও দূরে সরে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর বাজারে, রাস্তার মোড়ে আড্ডা দেওয়া এবং গ্রাম-পাড়া-মহল্লায় তৈরি হচ্ছে তাদের একাধিক গ্রুপ। বড়দের সঙ্গে বেয়াদবি, শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন করতেও দ্বিধা করে না উঠতি বয়সীদের এi শ্রেণিটা। আধিপত্য নিয়েও পরস্পরকে বিরোধে জড়াতে দেখা যায়। মূলত মোবাইল ফোনের অপব্যবহারের ফলেই উঠতি বয়সীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূচনা বলে শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবকদের ধারণা।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মনোরোগ চিকিৎসক "আহমেদ হেলাল সাহেব" এর মতে মোবাইলে ইন্টারনেট গেম আসক্তি অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, মদ ইত্যাদি আসক্তির মতোই। পার্থক্য হচ্ছে এটি আচরণগত আসক্তি, আর অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যের আসক্তি  হচ্ছে রাসায়নিক আসক্তি। মস্তিষ্কের যে অংশে (রিওয়ার্ড সেন্টার) ইয়াবা বা গাঁজার মতো বস্তুর প্রতি আসক্তি জন্ম নেয়, ঠিক সেই অংশেই ইন্টারনেট বা গেমের প্রতি আসক্তি জন্মায়। তাই একে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই । ।

তবে মোবাইল বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের আসক্তির মত বই পড়ার অভ্যেসও এক ধরনের আসক্তি। ছোটবেলায় আমার খালাতো বোন শাওন (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী)কে পাঠ্য বইয়ের বাহিরে নানাবিধ বই পড়ার আসক্তির কারণে খালার হাতে অনেক মাইর খেতে দেখেছি। এটি একটি মাত্র উদাহরণ, বই পড়তে পড়তে যে একসময় আসক্তির পর্যায়ে পৌঁছায়~ একথা অনস্বীকার্য।

কয়েকদিন আগে বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক Sumanto Aslam কে ফেসবুক পোস্টে লিখতে দেখিছি ~ উনি কোন এক ঘটনা চক্রে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আগামী দুই বৎসর আর বড়দের জন্য উপন্যাস লিখবেন না। লিখবেন, তবে শিশু কিশোরদের জন্য। একারণেই এবারের বই মেলায় উনার দুইটি কিশোর উপন্যাস বের হয়েছে। এটা সুমন্ত আসলামের বদান্যতা অথবা সামাজিক দায়বদ্ধতা। আবার আমার বন্ধু Atiqur Rahman এবার বই মেলা থেকে একগাদা বই কিনেছে, উদ্যেশ্য ওর পরিচালিত গ্রন্থাগারের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ান বাংলাভাষা-ভাষীদের মধ্যে বাংলা বই পড়ার সুযোগ করে দেয়া। হয়তো খুঁজলে এরকম আরও অনেক উদ্যোক্তাকেই পাওয়া যাবে, তবে ছেলেমেয়েদের বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে এসব উদ্যোক্তাদের উদ্যোগগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনার নামান্তর। মূল উদ্যোগটি নিতে হবে মা বাবার পক্ষথেকে । এই সর্বনাশা মোবাইল বা ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হতে পারে বই পড়ার আসক্তি ~ এজন্য প্রথমে মা বাবাকেই সচেতন হতে হবে, ছেলে মেয়েদের সময় দিতে হবে, বই কিনে দিতে হবে, বই পড়তে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শুধু বই মেলা নয়, বইয়ের দোকান থেকেও বইসহ বয়সোপযোগী পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা কিনে দিতে হবে । সেইসাথে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের অপব্যবহার যেন ছেলে-মেয়েরা করতে না পারে~ সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, বিশেষ করে রাতের বেলায় বাচ্চাদের কাছ থেকে ফোন নিজেদের দায়িত্বে নিয়ে নিতে হবে। 

এসবই হচ্ছে থিওরিটিক্যাল কথাবর্তা; মূল কথা হচ্ছে নিজ নিজ ছেলেমেয়েদের এই সর্বনাশা মোবাইল আসক্তি থেকে বের করে আনতে স্ব-স্ব পিতামাতাকে-ই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে। 

তবে নেশা বা আসক্তি; সে যা কিছুরই হোক না কেন ? তা কাটাতে অন্য আরেকটি নেশা বা আসক্তি ধরিয়ে দেয়ার বিকল্প নেই এবং আমার মতে সেটি হতে পারে বইয়ের নেশা বা বই পড়ার আসক্তি~

Comments

Popular posts from this blog

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...

ঠাকুর_বাবার_ঝুলী

গল্পঃ উপমহাদেশীয় আশরাফুল মাখলুকাত হতে শকুনে'র বাচ্চার শিক্ষা লাভ~ এক শকুনের বাচ্চা, একদিন তার বাবার কাছে বায়না ধরল~ বাবা আমি মানুষের মাংস খাব, এনে দাও না প্লিজ। বাবা শকুন বলল ঠিক আছে আজ সন্ধ্যায় এনে দিব। বিকেলে বাবা শকুন উড়ে গেল আর আসার সময়  ছেলের জন্য শূকরের মাংস নিয়ে এলো, বাচ্চা শকুন খেতে গিয়ে বললো এটাতো শূকরের মাংস বাবা, আমি তো মানুষের মাংস খেতে চেয়েছিলাম? বাবা শকুন ধরাখেয়ে একটু লজ্জা পেল এবং বলল ঠিক আছে বাবা~আজকে মানুষের মাংস এনে দিব, কিন্তু মানুষের মাংস পাওয়া সহজ কিছু নায়, সারাদিন ওড়াউড়ি করার পরও মানুষের মাংস না পেয়ে ঘরে ফেরার সময় একটা মরা গরুর মাংস নিয়ে এলো। যথারীতি বাচ্চা শকুন  মাংস মুখে দিয়ে বললো~ আরে তুমিতো গরুর মাংস এনেছ, মানুষের মাংস কোথায় ? তখন বাবা বুঝতে পড়লো বাচ্চাকে রাম বুঝ দিয়ে লাভ নাই, মানুষের মাংসই খাওয়াতে হবে।  বাবা শকুনের  মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, প্রথমে সে গরুর মাংস এর টুকরা মুখে নিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে ফেলল হিন্দুদের মন্দিরের সামনে, আবার শূকরের মাংস এর টুকরোটা নিয়ে একটা মসজিদের সামনে ফেলে দিয়ে চলে এলো।  কিছুক্ষণের ...

সুখ তুমি কি ?

সুখ_তুমি_কি? বড়_জানতে_ইচ্ছে_করে_আমার_জানতে_ইচ্ছে_করে~ রুনা লায়লার বিখ্যাত গানের ধারাবাহিকতায় #কেনই_বা_ফিনল্যান্ডের_মানুষ_পৃথিবীর_সবথেকে_সুখী_মানুষ? আসুন জেনে নেই~ গত ৪ বছর হলো জাতিসংঘের "সাসটেইনেবল সল্যুউশন নেটওয়ার্ক" বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে "ফিনল্যান্ডে'র নাম ঘোষণা করছে।  প্রতিবেশি তিন দেশ নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ড যথাক্রমে ফিনল্যান্ডের পরে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ  স্থানে অবস্থান করছে। পক্ষান্তরে আমেরিকানদের অবস্থান ১৪ তম, ব্রিটিশদের অবস্থান ১৯ তম, জাপানিজদের অবস্থান অনেক নীচে,  কিন্তু কেন ? সুখ কি তাহলে অর্থের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় ? সুখ একটি মানবিক অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।  সুখের সাথে সামগ্রিক নিরাপত্তা, ভবিষ্যত নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা, মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা বিশেষ করে পারিবারিক বন্ধনে অটুট থাকা এবং স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়  সম্পৃক্ত~ ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক ~ এসব দেশের পুলিশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-সেবা ব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের। উন্নত কর ব্যবস্থা ও সম্পদের পুনর্বন্টন...