২১শে ফেব্রুয়ারী'র সেকাল এবং একাল~
আমার জীবনকালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ শহীদ ভাষা দিবস তথা অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিক সংক্ষিপ্ত উপাখ্যান~
গত উনিশ শতকের সত্তুরের দশকের দিকে আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, তখনকার ২১শে ফেব্রুয়ারি উৎযাপন~
গ্রামের অধিকাংশ স্কুলেই শহীদমিনার ছিল না, পাড়া মহল্লার কথা না হয় বাদই দিলাম। সেসময় গ্রামের বাজারঘাট সহ স্কুল গুলোতে ২০শে ফেব্রুয়ারি দিন ও দিবাগত সারারাত সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় কলাগাছ বা বাঁশ বেতের মাধ্যমে রঙিন কাগজের মোড়কে যেমন শহীদ মিনার তৈরি করা হতো, তেমনই স্কুলের পূরমাঠ রশির সাথে রঙিন কাগজ মুড়ে সাজানো হতো। অতঃপর শীতের সকালে, খালিপায়ে শিশির ভেজা রাস্তা ধরে, লাইনে দাড়িয়ে, ২১শের গান গাইতে গাইতে, শিমুলফুল হতে নিয়ে, শ্রদ্ধাভরে আগের দিনে নির্মিত শহীদ মিনারের বেদীতে পুষ্পার্ঘ দেয়া হতো এবং শহীদদের সম্মানে নিরবতা পালন করা হতো । লাইনে দাঁড়ানোর পর থেকে হেঁটে হেঁটে শহীদ মিনার যাওয়া অব্দি আমরা কেউই হাসি ঠাট্টা করতে পারতাম না। মনে হতো কোন ধর্মীয় পবিত্র কাজের মধ্যে আছি, অনেকটা মসজিদের ভিতর অবস্থান করার মত। এরপর সারাদিন দেশাত্মবোধক গান ও রাত্রে ২১ এর উপর নাটক মঞ্চস্থ হতো । সবাই কালো ব্যাচ ধারণ করতো।
এরপর আশির দশকে কলেজের জীবনেও তো --- পাবনা শহরের পড়া-মহল্লা'র ভিতর দিয়ে কাক ডাকা ভোরে,নগ্নপায়ে, হারমোনিয়াম হাতে, লাইন ধরে, ২১শের গান গাইতে গাইতে, কি ভাবগম্ভীর পরিবেশেই না শহীদ মিনারে, শহীদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করতাম ?? পুরোদিন সমস্ত শহরে দেশাত্মবোধক বাংলা গান চলতো~জায়গায়-জায়গায় , মোড়ে-মোড়ে শিল্পগোষ্ঠীদের ২১ শে'র গান গাওয়া, পথনাটক মঞ্চস্থ হওয়া সহ পুরোদিন ভাবগাম্ভীর্যের সাথে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হতো। সব শ্রেণীর মানুষ কালো ব্যাচ ধারণ করতো।
এরপর BIT তে তো আমাদের নেতৃত্বেই সবধরনের রাষ্ট্রীয় দিবস উৎযাপন হতো~
অথচ আরও ৬/৭ বছর আগে, মিরপুরে নতুন ফ্ল্যাটে, নতুন ভাবে বৌবাচ্চাদের নিয়ে ,নতুন জীবন শুরু করেছি মাত্র --
মিরপুরে প্রথম ২১শে ফেব্রুয়ারি, ছেলে - মেয়ে (খুবই ছোট) দের সাথে আনুষ্ঠানিক উৎযাপন করেছি। যথারীতি আমি, ছেলে ও মেয়ে তিনজনই খালি পায়ে প্রভাতফেরি তে অংশ নিতে ভোরে বেড়িয়েছি। বিভিন্ন স্কুলের সম্ভবত ৩/৪শত ছেলেমেয়ের লাইন, আমরা তিনজনই শুধু খালি পেয়ে বাকি সবাই কেডস/জুতা সহ প্রভাতফেরি'র লাইনে। ,হৈ হুল্লোর আর চিল্লাচিল্লির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত শহীদদের শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়েছিলাম সেদিন। তোবে সেদিনের প্রভাত-ফেরিকে রাজনৈতিক মিছিল বলাটাই যুক্তজুক্ত হতো। বাসায় ফিরে ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল -- এটা কি শহীদ দের শ্রদ্ধা জানানো নাকি বেয়াদবি করা --- কোনটা বাবা ??
এরপর থেকে অদ্যবধি ছেলেকে নিয়ে আর প্রভাত ফেরিতে যাই না। তবে পরিবার নিয়ে নিজেদের মতকরে শহীদ মিনারে যাই এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই ।
গতবছর ২০২১ সালে জাতীয় শহীদ মিনারে 'চুয়েট ছাত্রলীগ এলামনাই' এর পক্ষ হতে ফুলদিতে ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনের অভিজ্ঞতাও যে আমার জন্য স্বস্তিদায়ক ছিল তা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে যারা শহীদ মিনারে গিয়েছিল, তাদের সকলকে মনে হয়েছে তারা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে এসেছে মাত্র, আর বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যানারে যে সমস্ত ছেলে মেয়েরা সেখানে যায় বা গিয়েছিল, তাদের মূল উদ্দেশ্য মনে হয়েছে মানুষকে দেখানো আর ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া, মেয়েদের আচরণ অনেকটা ফ্যাশন শো এর মত মনে হয়েছে। সত্যিকারের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে শহীদ মিনারের বেদীতে শহীদদের উদ্দেশ্যে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য কেউ এসেছে বলে আমার মনে হয় নি। তবে সারাদিনে ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে মাইকে দেশাত্মবোধক গান বাজাতে দেখেছি, যা এইবার ব্যতিক্রম। আমাদের মিরপুরে কোন জায়গায় মাইকে কোন গান-বাজনা বা দেশাত্মবোধক গান বা একুশের গান শুনতে পাই নাই। সারাদিনই এলাকা নিশ্চুপ ও নিস্তব্ধ ছিল। বিকেলে বের হয়ে আইইবি শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছি এবং একুশের বইমেলা হতে কিছু বই কিনে বাসায় ফিরেছি।
এই হচ্ছে সংক্ষেপে আমার জীবনকালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ শহীদ ভাষা দিবস তথা অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিক উপাখ্যান~
Comments
Post a Comment