Skip to main content

বাংলায়_১ম_গজল_রচয়িতা_কাজী_নজরুল_ইসলাম এবং ~গজল_রচনার_পিছনের_কিছু_গল্প~

 #বাংলায়_১ম_গজল_রচয়িতা_কাজী_নজরুল_ইসলাম এবং ~#গজল_রচনার_পিছনের_কিছু_গল্প~

বাংলায় প্রথম গজল রচনা করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ভারতে গজল আনার কৃতিত্ব যদি "আমির খসরু"র হয়, তো বাংলায় সে দাবিদার নজরুল ইসলাম। আর সেজন্য অনেকে তাকে বাংলার ভগীরথ-ও বলে থাকেন। কারণ তিনিই প্রথম গজল-গানের কথা ও সুর-কল্লোলে বাংলাকে ভাসিয়েছিলেন। 

ভারতীয় উপমহাদেশে গজল বলতে আমরা বুঝি ফার্সি ও উর্দু ভাষার সংমিশ্রণে প্রণয়গীতি বা ভালোবাসার গান। আর এ বিষয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে যিনি, তিনি হলেন মির্জা গালিব। আর বাংলার গালিব হলো নজরুল ইসলাম। গজল রচনা করতে গেলে উর্দু ও ফার্সি ভাষা জানাটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোটবেলায় কাকা 'বজলে করিমে'র কাছে উর্দু ভাষায় পাঠ নিয়েছিলেন তিনি,  হয়তো সেই ভাষা চেনার ক্ষমতাই তাকে গজল  রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১ম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্যেশ্যে সৈন্যদলে নাম লেখালেন কাজী সাহেব, চলে গেলেন করাচি, সেখানে এক পাঞ্জাবি মৌলভীর কাছে ফার্সি শিখতে যেতেন তিনি গজলের প্রতি ভালোবাসার টানে। নজরুল ছিলেন রোমান্টিক কবি । বাংলা ছাড়াও কবির স্বপ্নের দেশ ছিল ইরান। একারণেই বাংলার মতোই ইরান-তুরানকেও কবি তুলে ধরতে চাইতেন বাংলা কাব্যে । তার এই চেষ্টার সার্থক রুপ-ই হলো "বাংলা-গজল"।

সংগীত শিল্পী "ভাস্বতী দত্তে"র লেখা থেকে জানা যায়~   ''কাজী সাহেব" একবার দিল্লি বেড়াতে গিয়েছিলেন, সেখানে দেখা হয়েছিল "জামা_মসজিদে'র ইমাম সাহেবের সঙ্গে, ইমাম সাহেবের গলাটা ছিল দারুণ মিষ্টি। একদিন তার গলায় এক ফার্সি গজল শুনে অভিভূত হয়ে গেলেন নজরুল ইসলাম, গজল টি ছিল "চাষ্টি আউর রুকমেদি~~~ 

গজলটি শুনে তিনি এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তিনি লিখে ফেললেন বাংলায় গজল, বাংলা গানের জগতে এক নতুন ধারার সৃষ্টি হলো "বাংলা-গজল"। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন~ এই গানটাই ছিল তার প্রথম রচিত বাংলা গজল, গানটি ছিল "কে বিদেশী, মন উদাসী, বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে"~~~

             'দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ে'র ছেলে 'দিলীপ রায়' ভিশন অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের, বন্ধু নয় নিজের ভাইয়ের মত ভালবাসতেন দিলীপ রায় নজরুলকে । নজরুলের "গজল-কে" জনপ্রিয় করার অন্যতম কারিগর ছিলেন এই 'দিলীপ রায়', বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দ্বিজেন্দ্রগীতি এবং নিজের গান পরিবেশনের মাঝে 'দিলীপ রায়' নজরুলের বাংলা 'গজল ' পরিবেশন করতেন । তার প্রিয় গজল ছিল ~"বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিসনে আজি দোল"~ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই গানের অনুরোধ আসতো  বারবার। গানটির অসামান্য জনপ্রিয়তার জন্য নজরুলের গজল-গীতিগুচ্ছ "বুলবুল" উৎসর্গ করেছিলেন "দিলীপ রায়" কে ।      

               খুব সহজে এবং অল্প সময়ে নজরুল গান সৃষ্টি করতে পারতেন । একদিন 'দিলীপ রায়' ধরলেন কাজী নজরুলকে~ বললেন, কাজী-ভাই আজ আমাকে অমুক সভায় গজল গাইতে হবে, তুমি লিখে দাও একটা নয়া গজল । নজরুল একগাল হেসে বললেন~ এ আর এমন কি ? দিলীপ রায়ের হাত থেকে খাতা টান দিয়ে নিয়ে একটানা লিখে ফেললেন একটি গজল। 

গজল টি ছিল~"এত জল, ও কাজল চোখে, পাষাণী আনলে বলো কে?" গানটি উনি গাইতেন হিন্দুস্থানী লোকসঙ্গীতের ঢলে। 

পরবর্তীকালে গানটি শুনে "অতুলপ্রসাদ-সেন" এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, উনার অনুরোধে  তিনি অনুরূপ আরেকটি গান লিখেছিলেন~ "জল বলে চল, মুসাফির চল, তোর আঁখিজল হবেনা বিফল," এরকম নানান ঘটনা জড়িয়ে আছে এই সমস্ত গজল রচনার সঙ্গে~

              গজলে নজরুলের অন্যতম কৃতিত্ব হলো~ বাংলা ভাষায় অন্য শব্দের ব্যবহার, এত অনায়াসে তার ব্যবহার করেছেন যে, গান শোনার সময় অতটা মনেই হত না, কিন্তু শেষ হওয়ার পর মনে হতো কি অনায়াসে কঠিন শব্দগুলো পার করে চলে এসেছি, অথচ কোথাও কখনো এতটুকুও হোচট খাইনি, এ এক অসামান্য অলংকার। বাংলা গানের দেবীকে ইরানের জওর পরিয়ে তাকে আরও খুব-ছুরত করেছেন কাজী সাহেব । তার কবিতায়ও গজলের কথা এসেছে বারবার ।

            ১৩৩৩ বঙ্গাব্দ, অগ্রহায়ণ মাস, কলকাতা "আর্লফ্রেড-হলে" বিশেষ অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠান এর সেরা আকর্ষণ মিসরীয় নর্তকী "মিস ফরিদার" নাচ । নির্দিষ্ট দিনে নজরুল বন্ধুদের সাথে গেলেন অনুষ্ঠান দেখতে, সকলের সাথেই বসেছিলেন দর্শকাসনে । বেশ কিছু গানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন "মিস ফরিদা"। তার মধ্যে একটি ফার্সি গজলও ছিল ~ "না জানে কাব রও মে দিলা দিয়া"~ এই গানের ভাব ও ভাষা কবির মনকে এতটাই স্পর্শ করলো যে, কবি হল থেকে বেড়িয়ে সোজা বাসায় চলে এলেন, টেনে নিলেন খাতা, লিখলেন গজল ~ "আসলো যখন ফুলেরও ফাগুন"~~~~ 

এই গোজলটিও সেসময় দারুন জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

               লেটো-দলে থাকার সময়-কে বাদ দিলে মাত্র ২২ বছর ধরে তিনি গান রচনা করেছেন, ১৯২১ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত যা লিখেছেন, তা মূলত সমাজ জাগরণের গান । এর পরের কয়েক বছর ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সময়ে রচিত কবির লেখা গানগুলো বাংলা গানের জগতে পরিচিত "গজল" হিসেবে । কবি'র গান তখন বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল, কবি'র একটি অভ্যাস ছিল, রাস্তায় চলতে চলতে বা কারো সাথে কথা বলতে বলতে হয়তো একটা ভালো লাইন মনের মধ্যে এসে গেল, সঙ্গে সঙ্গে সেই লাইন একটা আলাদা খাতা বা কাগজে লিখে রাখতেন । পরে সেই লেখা থেকে মিলিয়ে মিলিয়ে বা তার মাঝে দু-চার লাইন যোগ করে, একটা পুরো গান দাঁড় করে ফেলতেন।

            "গ্রামোফোন" কোম্পানির সঙ্গে কাজী  নজরুলের সম্পর্ক ছিল গভীর, দীর্ঘদিন গ্রামোফোন কোম্পানির ট্রেইনার ছিলেন তিনি, বহু মানুষ তার কাছ থেকে ট্রেনিং নিয়ে গান করেছেন । এদের মধ্যে প্রথম দিককার ইন্দুবালা দেবী, আঙ্গুর বালা দেবী, কমলা ঝরিয়াসহ অনেকেই ছিলেন । নজরুলের গানকে শুরুর দিকে জনপ্রিয় করেছিলেন এরাই। আঙ্গুরবালা দেবীকে নজরুল একটু বেশি স্নেহ করতেন। কাজী নজরুল চাইতেন তাঁর গানের প্রতিটির কথা যেন তারই মতো উচ্চারিত হয়, তাহলেই গানের ভাব প্রকাশ পাবে । একবার একটি গানের লাইনে ছিল "বুকে কি বিন্দিল কেয়া"~ আঙ্গুরবালা দেবী ভেবেছিলেন কবি মনেহয় নিজের ভাষা অনুযায়ী "বিন্দিলো" বলেছেন, তাই অঙ্গুরবালা দেবী চলতি ভাষায় "বিধিলো" গাইছিলেন~কিন্তু কিছুতেই গানের ভাব প্রকাশ হচ্ছিল না। অবশেষে যখন তিনি "বিন্দিলো" গাইলেন তখন এক নতুন ছন্দ মাধুর্য খুঁজে পেলেন, যা মিসিং ছিল তখন। শব্দচয়ন এবং সংযোজনে নজরুল ছিলেন অদ্বিতীয় ।   

           সংগীত শিল্পী "আব্বাস উদ্দিন" তার স্মৃতিচারণে বলেছেন~ কবি রচিত গজল-গানের সুরে সেই বাংলার আকাশ-বাতাস নতুন সুরে কথায়-ভাবে আমোদিত হয়েছিল ।  বাংলাভাষাকে নতুন ভাষার সংস্পর্শের সমৃদ্ধ করার বাসনাতেই কবি অনুবাদ করেছিলেন রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ এবং  রুবাইয়াৎ-ই-খৈয়াম। প্রতিদিনের গান সৃষ্টির মাঝে নজরুল প্রমাণ করেছেন তাঁর সৃষ্ট সুরের-সোহাগে তন্দ্রা লাগে কুসুম-বাগে।

 সেজন্যই তিনি বাঙালির প্রিয় কবি, প্রিয় গালিব, প্রিয় ভগীরথ~

লেখক: মো: আজিজ মিশির সেলিম।

সাবেক চুয়েট ছাত্রলীগ সভাপতি

Comments

Popular posts from this blog

সময়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের ধরন-ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও প্রয়োগিক পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না ?

 সময়ের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন হতে পারে বলে আমার অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা মনে করে থাকেন, এবিষয়ে আমার জানা ইসলামের আলোকে একান্ত বেক্তিগত মতামত~           আপনি বা আপনারা যদি ইসলামকে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম বলে বিশ্বাস করে থাকেন ; তাহলে আপনাদের এই ধারণা আল্লাহকে বা সৃষ্টিকর্তাকে ছোট বা খাটো করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ এমন একটি সত্তা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত বা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটবে, বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে যেসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে, সে-সব কিছুই তিনি অবগত ছিলেন এবং আছেন। কাজেই সময়ের সাথে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যদি ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ মনে করতেন, তাহলে উনি উনার বার্তাবাহক অর্থাৎ রাসূল মুহম্মদ সা: মারফত তা জানিয়ে দিতেন। উনি ভবিষ্যতের যেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন, মুহম্মদ সা: এর মাধ্যমে তা জানিয়ে দি...

মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?

 মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?  ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।  ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়) অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)  অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~ এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ? কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি। তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে। কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~ গালির সংজ্ঞা কী? "গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নি...

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...