Skip to main content

"খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে, বিরাট শিশু আনমনে। প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা, নিরজনে প্রভু নিরোজনে।

বলা হয় ' মানুষ ' হচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীব ।  আধুনিক বিজ্ঞান এবং বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ মারফত প্রকাশিত সৃষ্টিকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এখন পর্যন্ত ' মানুষই ' হচ্ছে একমাত্র বিবেক ও বুদ্ধি সম্পন্ন প্রাণী।  প্রতিটি মানুষই কমবেশি বিবেকবান অর্থাৎ ভালো-মন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করে  সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমবেশি প্রতিটি মানুষেরই আছে। এরপরও সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষের মধ্যেই সবচাইতে বেশি শ্রেণী-বিভেদ বিদ্যমান, যা বিবেক বুদ্ধি বিবর্জিত সৃষ্টিকুলের অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে ততটা প্রকট ভাবে পরিলক্ষিত হয় না। অথচ সৃষ্টিকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী মানুষকে এই দুইটা জিনিস এক্সট্রা দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র শ্রেণীবিভাগ বা শ্রেণী-বিভেদ কমানোর জন্য।

 গতকাল ঢাকাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি, মইদুল হাসান সুজন এবং স্বাক্ষর (সুজনের ভাগ্নে) প্রাইভেট-কার যোগে বৃষ্টির ভিতরেই একটা জায়গায় যাচ্ছিলাম। গাড়ির ভিতরে আরামদায়ক উষ্ণ পরিবেশে থেকেও সুজন বোলছিলো যে, আজকের দিনটা বাসায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকাটা অধিক আরামদায়ক হতো। কথাটা মিথ্যা নয়, এইটুকু বৃষ্টি-বিলাস বা ঠান্ডা-বিলাস উৎযাপন করার মতো সামর্থ্য সৃষ্টিকর্তা আমাদের দিয়েছেন। 

কিন্তু একই সময়ে আমাদের মতই কয়েকজন মানুষ "ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট" (IEB) এর সামনে "রমনা ফুটওভার ব্রিজের" নিচে জবুথবু হয়ে বসে নিজেদের সহ "ছেঁড়া-কাঁথা-কম্বল" গুলি কে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। প্রায় 15 বছর যাবত একটা ছিন্নমূল পরিবার এই ফুটওভার ব্রিজের নিচে বসবাস করে আসছে। এই কয়েক জন মানুষের জন্য বৃষ্টি কখনোই বিলাসী কিছু নয়, সেটি গ্রীষ্ম অথবা শীত যে সময়েই হোক না কেন ? সামান্য বৃষ্টির পানি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার মতো একটি আশ্রয়ের ব্যবস্থা তারা সারাজীবনেও করতে পারেনি।  

 সুকান্ত ভট্টচার্যের ‘শীতের সূর্য’ কবিতার ভাষ্য অনুযায়ী ওরা 'শীতের বৃষ্টি' নয়; বরং  ‘শীতের সূর্য’ এর জন্য অধীর আগ্রহে বসে থাকে ।  কবি লিখেছেন~                                             ‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!                                               হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায় আমরা থাকি।   যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,      ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।                            হে সূর্য! তুমি তো জানো,                                          আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!                        সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,                                            এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,                                        কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই!’

সুকান্তের কবিতার তুলনায় সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে কতোই না ভালো রেখেছেন ? আমাদের পরিবারের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং চলাচলের জন্য নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা তিনি করে দিয়েছেন। আবার ঠিক এই সময়েই "অ্যামাজনে'র মালিক "জেফ বেজোস" নিজের ও পরিবারের আমোদ ফুর্তির জন্য একটি 'ইয়ট' (বিলাসবহুল বড় সাইজের নৌকা) তৈরী করছে, যার খরচ ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪৩৬৫ কোটি টাকা  সৃষ্টিকর্তা তাকে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে মাঝেমধ্যে সাগরে সময় কাটানোর জন্য ৪৩৬৫,০০০০০০০/= টাকা খরচ করার তৌফিক দিয়েছেন। 

আবার  সৌদি যুবরাজ তার ইয়টে "লিওনার্দো দা ভিঞ্চি"র আঁকা একটি চিত্রকর্ম রেখেছেন, যার মূল্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪০৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা সৌদি যুবরাজকে তার পছন্দের নৌকায় একটা ছবি টাঙ্গিয়ে রাখার জন্য ৪০৫০,০০০০০০০০/= টাকা খরচ করার তৌফিক দান করেছেন। 'ইয়ট'র মূল্য এখানে নাই বা উল্লেখ্য করলাম।

এই দুই ধনকুবেরকে আমোদ-ফুর্তি বা শখ পূরণের জন্য একটি 'নৌকা'এবং একটি 'চিত্রকর্মে'র পিছনে  ৮৪১৫ কোটি টাকা খরচ করার তৌফিক সৃষ্টিকর্তাই তাদেরকে দিয়েছেন।।

আবার রমনা ফুটওভার ব্রিজের নিচে বাসকরা পরিবারকে সারাজীবনেও একটি মাথাগোঁজার মত ব্যবস্থা করার যোগ্যতা বা তৌফিক সৃষ্টিকর্তাই তাদেরকে দেননি~ 

এরকম ছিন্নমূল পরিবার শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশ নয়, লাখ লাখ এরূপ পরিবার আফগানিস্থান, ইয়েমেন, সিরিয়া, আফ্রিকা সহ সারাবিশ্বেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আফগানিস্থান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় অপুষ্টি ও ক্ষুধার জ্বালায় মারা যেতে বসেছে লাখ লাখ শিশু~

আবার উপরুলেখিত ধনকুবেরদের মত মানুষের সংখ্যাও পৃথিবীতে কম নয়, আর আমাদের মত নিজ-ঘরেবসে শীত বা বৃষ্টিবিলাস করার মতো মানুষের পরিমাণ নাই বা উল্লেখ করলাম~

তোমার সৃষ্ট একই আলো-বাতাস-পানি, একই পৃথিবী;       কিন্তু মানুষে মানুষে কতো পার্থক্য ? কতো বৈষম্য ?      আবার এই পার্থক্য ও বৈষম্য কমানোর জন্য নাকি একমাত্র মানুষকেই তুমি বিবেক ও বুদ্ধি দিয়েছ ? এই বিবেক বুদ্ধিও কি তুমি সমভাবে বণ্টন করেছো ? এখানেও তো অনেক বৈষম্য বা পার্থক্য বা কমবেশি করেছো~

এর পিছনে কি তোমার কোন উদ্যেশ্য আছে ?                     না-কি এটি তোমার খেয়াল খুশি বা মর্জি বা খেলাধুলার  অংশ ? যেখানে মানুষ হচ্ছে তোমার খেলার পুতুল বা গুটি ?

কাজী নজরুল ইসলাম কি একারণেই বলে গেছেন ~? ~

"খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে

বিরাট শিশু আনমনে~

প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা~

নিরজনে প্রভু নিরজনে"।।


"শূণ্যে মহা আকাশে,

তুমি মগ্ন লীলা বিলাসে~

ভাঙ্গিছ গড়িছ নীতি ক্ষণে ক্ষণে~

নিরজনে প্রভু নিরজনে"।।


"নিত্য তুমি হে উদার

সুখে-দুখে অবিকার~

হাসিছ খেলিছ তুমি আপন সনে~

নিরজনে প্রভু নিরজনে"~ ~ ~

Comments

Popular posts from this blog

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...

ঠাকুর_বাবার_ঝুলী

গল্পঃ উপমহাদেশীয় আশরাফুল মাখলুকাত হতে শকুনে'র বাচ্চার শিক্ষা লাভ~ এক শকুনের বাচ্চা, একদিন তার বাবার কাছে বায়না ধরল~ বাবা আমি মানুষের মাংস খাব, এনে দাও না প্লিজ। বাবা শকুন বলল ঠিক আছে আজ সন্ধ্যায় এনে দিব। বিকেলে বাবা শকুন উড়ে গেল আর আসার সময়  ছেলের জন্য শূকরের মাংস নিয়ে এলো, বাচ্চা শকুন খেতে গিয়ে বললো এটাতো শূকরের মাংস বাবা, আমি তো মানুষের মাংস খেতে চেয়েছিলাম? বাবা শকুন ধরাখেয়ে একটু লজ্জা পেল এবং বলল ঠিক আছে বাবা~আজকে মানুষের মাংস এনে দিব, কিন্তু মানুষের মাংস পাওয়া সহজ কিছু নায়, সারাদিন ওড়াউড়ি করার পরও মানুষের মাংস না পেয়ে ঘরে ফেরার সময় একটা মরা গরুর মাংস নিয়ে এলো। যথারীতি বাচ্চা শকুন  মাংস মুখে দিয়ে বললো~ আরে তুমিতো গরুর মাংস এনেছ, মানুষের মাংস কোথায় ? তখন বাবা বুঝতে পড়লো বাচ্চাকে রাম বুঝ দিয়ে লাভ নাই, মানুষের মাংসই খাওয়াতে হবে।  বাবা শকুনের  মাথায় একটা বুদ্ধি এলো, প্রথমে সে গরুর মাংস এর টুকরা মুখে নিয়ে সেখান থেকে উড়ে গিয়ে ফেলল হিন্দুদের মন্দিরের সামনে, আবার শূকরের মাংস এর টুকরোটা নিয়ে একটা মসজিদের সামনে ফেলে দিয়ে চলে এলো।  কিছুক্ষণের ...

সুখ তুমি কি ?

সুখ_তুমি_কি? বড়_জানতে_ইচ্ছে_করে_আমার_জানতে_ইচ্ছে_করে~ রুনা লায়লার বিখ্যাত গানের ধারাবাহিকতায় #কেনই_বা_ফিনল্যান্ডের_মানুষ_পৃথিবীর_সবথেকে_সুখী_মানুষ? আসুন জেনে নেই~ গত ৪ বছর হলো জাতিসংঘের "সাসটেইনেবল সল্যুউশন নেটওয়ার্ক" বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ হিসেবে "ফিনল্যান্ডে'র নাম ঘোষণা করছে।  প্রতিবেশি তিন দেশ নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ড যথাক্রমে ফিনল্যান্ডের পরে ২য়, ৩য় ও ৪র্থ  স্থানে অবস্থান করছে। পক্ষান্তরে আমেরিকানদের অবস্থান ১৪ তম, ব্রিটিশদের অবস্থান ১৯ তম, জাপানিজদের অবস্থান অনেক নীচে,  কিন্তু কেন ? সুখ কি তাহলে অর্থের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় ? সুখ একটি মানবিক অনুভূতি যা ভালোবাসা, তৃপ্তি, আনন্দ বা উচ্ছ্বাস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।  সুখের সাথে সামগ্রিক নিরাপত্তা, ভবিষ্যত নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা, মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা বিশেষ করে পারিবারিক বন্ধনে অটুট থাকা এবং স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়  সম্পৃক্ত~ ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, ডেনমার্ক ~ এসব দেশের পুলিশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-সেবা ব্যবস্থার ওপর আস্থা আছে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের। উন্নত কর ব্যবস্থা ও সম্পদের পুনর্বন্টন...