ইউক্রেনে পুতিন বা রাশিয়ার উদ্যেশ্য কি ?
ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন বা রাশিয়ার লক্ষ্য কি ?
পুতিন বা রাশিয়া কি সঠিক পথেই গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছে ?
গতকাল রাশিয়ার সেনাপ্রধান ইউক্রেন অভিযানের লক্ষ্য বা উদ্যেশ্য সম্পর্কে কিছু কথা বলেছেন, তিনি বলেছেন দোনবাস (লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক) এলাকাকে মুক্ত ও স্বাধীন করাই তাদের এই অভিযানের মূল উদ্যেশ্য বা লক্ষ্য এবং তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
উল্লেখ্য; রাশিয়া ২০১৪ সালেই ক্রিমিয়া দখলে নিয়েছে এবং ক্রিমিয়া ও দোনবাস এর কাছাকাছি ইউক্রেনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকা মারিওপোল দখল নিতে গত একমাস সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে । তাছাড়া এপর্যন্ত লুহানস্ক এর ৯০% এবং দোনেৎস্ক এর প্রায় ৬০% এলাকা দখলে নিয়েছে রাশিয়া।
রাশিয়ান অভিযানের উপরোক্ত চিত্র এটাই প্রমাণ করে যে দোনবাস (লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক) এলাকাকে মুক্ত ও স্বাধীন করাই তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য বা উদ্যেশ্য ; কিন্তু এটাই কি তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্যেশ্য ?
তাহলে তারা ইউক্রেন সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণ বা অস্ত্রসমর্পন করতে বলছেন কেন ?
কেনোই বা ভলদেমির জেলেনস্কির সাথে আলোচনায় বসতে রাজি না হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন ? কেনোই বা ইউক্রেন ও পশ্চিমা গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে যে রাশিয়া মে মাসের ৯ তারিখ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে নিতে চায় ?
দোনবাস (লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক) তো অনেকটাই মুক্ত হয়েছে, তাহলে আরো ১ মাস ৯ দিন রাশিয়া কেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবে ?
এখন একটু যুক্তি-নির্ভর কিছু-বিষয়ের দিকে মনোনিবেশ করা যাক~
এখন পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার কে, আমেরিকাসহ বিশ্বের কেউই জানে না। বিষয়টির অবতারণা করলাম এই জন্য যে, পুতিন এই যুদ্ধের অনেক বিষয়ে এতটাই গোপনীয়তা অবলম্বন করছেন যে মার্কিন গোয়েন্দারাও ধোঁয়াশার মধ্যে পড়ে গেছেন। এখন পর্যন্ত যখন কমান্ডিং অফিসার সম্পর্কে জানা যায় নি, তখন এই যুদ্ধে পুতিনের আসল লক্ষ্য বা উদ্যেশ্য বা গন্তব্য সম্পর্কে যে শেষ অবধি কিছুই জানা যাবে না~ এটা প্রায় নিশ্চিত।
তবে নাটের গুরু "আলেকসান্দর দিগিন" এবং "ভ্লাদিমির পুতিন" বিষয়ে যেটুকু জানা যায়, যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সেখান থেকে এই যুদ্ধের উদ্যেশ্য সম্পর্কে একটি ধারণা করা যেতে পারে~
একথা অনস্বীকার্য যে, উনারা সোভিয়েত আমলের সাম্রাজ্যবাদী ও কুলীন ধ্যান ধারণায় বিশ্বাসী। সে সময়ে বিশ্বব্যাপী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি এবং মর্যাদার বিষয়টি উনাদেরকে নস্টালজিক করে রেখেছে। তাছাড়া পুতিনের বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে যাওয়ায় আক্ষেপ ফুটে ওঠেছে বহুবার এবং এক্ষেত্রে সাবেক সোভিয়েত নেতাদের সমালোচনা করতেও পিছপা হননি উনি। তাছাড়া উনার অনেক কথার মাধ্যমে এটাও প্রকাশ পেয়েছে যে,উনি সাবেক সোভিয়েত ভুক্ত দেশ সমূহকে এখনও স্বাধীন দেশ হিসেবে মানতে পারেন না। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে উনি যে ইতিহাস নির্ভর নাতিদীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাতে তিনি এটাই বুঝিয়েছিলেন যে ~ ঐতিহ্যগত ভাবেই ইউক্রেন আসলে কোন স্বাধীন ভূখণ্ড বা দেশ কখনোই ছিল না। অর্থাৎ পুতিন ইউক্রেনকে স্বাধীন দেশ হিসেবে মানতে নারাজ।
এই যখন অবস্থা, তখন এটা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে, "আলেকসান্দর দিগিন" এবং "ভ্লাদিমির পুতিন" এখনও সাবেক সোভিয়েত আমলের ধ্যান/ধারণায় বিশ্বাসী।
তবে পুতিন জানেন যে শত চেষ্টাতেও আর সোভিয়েত যুগে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন যে, একটি শক্তিশালী রুশ ফেডারেশন গঠনের মাধ্যমে অতীতের কুলীন আভিজাত্য ও প্রভাব প্রতিপত্তির অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তাছাড়া ওয়ার'শ এর বিলুপ্তির পর বর্তমান ন্যাটো কে কাউন্টার দিতে যে রাশিয়া একা sufficient না ~ এটাও পুতিন ভালোভাবে বোঝেন।
মূলতঃ একারণেই রাশিয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের সমন্বয়ে, বিশেষ করে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশ সমূহের সমন্বয়ে (অনেকটা ওয়ার'শ ধাঁচের) একটি শক্তিশালী রুশ ফেডারেশন বা বলয় গঠনের প্রয়োজন, যে ফেডারেশনের বা বলয়ের অন্তর্গত দেশ সমূহ অনেকটা বেলারুশ টাইপের আজ্ঞাবহ দেশ হবে।
২০০৮ সালে জর্জিয়াতে সামরিক অভিযান পরিচালনা, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, ২০২০ সালে বেলারুশ আক্রমণ করে সেখানে রুশপন্থী সরকার কায়েম, এরপর কাজাখিস্থানে বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী প্রেরণ, এবছর ইউক্রেনের দনেতস্ক ও লুহানস্ক কে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান; এমন কি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা, ইত্যাদি বিষয়গুলিকে একসুতায় গাথলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যেকোন ভাবেই হোক না কেন রাশিয়া সোভিয়েত আমলের অনুগত ২১ টি রাষ্ট্রে(সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ১৪ টি + ওয়ার'শ ভুক্ত ৭ টি)'র মত আজ্ঞাবাহী ৮/১০ টি রাষ্ট্রের একটি বলয় বা ফেডারেশন গঠন করতে চায়, যাতে ন্যাটোর সমকক্ষ কিন্তু বিরোধী একটি প্ল্যাটফর্ম পুনরায় বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার নেতৃত্ব দিবে রাশিয়া।
এককথায় পুতিন পুনরায় বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধ কালীন বা শীতল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে চায়, যাতে বিশ্বের যেকোন আন্তঃদেশীয় সমস্যা সমাধানে আমেরিকা একাই মোড়লগীরি ফলাতে না পারে, সবকিছুতেই যাতে রাশিয়ার একটি ভূমিকা থাকে। অর্থাৎ সোভিয়েত আদলে না হলেও একটু ভিন্ন আঙ্গিকে রাশিয়া'কে সোভিয়েত ইউনিয়নে'র আসনে আসীন করাই "পুতিন ও আলেকসান্দর দিগিন" এর লক্ষ্য।
"অনেকটা পুরানো মদ নতুন বোতলে রেখে পান করার মতো"; যেখানে স্বাদ ও গন্ধ আগের মতোই থাকবে কিন্তু সকলেই বুঝবে এটা নতুন কিছু~
উপরোল্লিখিত বিশ্লেষণের আলোকে~
এটা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে ইউক্রেনে পুতিনের লক্ষ্য বা উদ্যেশ্য দুইটি ১) ইউক্রেন কে রাশিয়ার সাথে একীভূত করা অথবা,
২) ইউক্রেন এর সংবিধান পরিবর্তন করে স্থায়ীভাবে বেলারুশে'র মত রুশপন্থী সরকার ব্যবস্থা কায়েম করা, সেইসাথে দোনবাস ও ক্রিমিয়ার উপর ইউক্রেনের দাবি প্রত্যাহার করে নেয়া।
সম্ভবত একনম্বর নয়, দুই নম্বর উদ্যেশ্য হাসিলের দিকেই এগুচ্ছে পুতিন। তবে পানি যতদূর গড়িয়েছে তাতে মনে হয়, সেক্ষেত্রেও ইউক্রেন কে অনেকটাই ত্যাগ স্বীকার করতে হবে~ ক্রিমিয়া, দনেতস্ক ও লুহানস্ক এর মত তিনটি প্রদেশকে ছেড়ে দিতে হবে রাশিয়ার হাতে।
ইউক্রেনে আগ্রাসন চালানোর পিছনে আরেকটি অন্তর্নিহিত কারণ থাকতে পারে রাশিয়ার~ সেটি হলো অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে চীনের উত্থান। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চীন বিশ্বরাজনীতিতে বা মোড়ল_গীরিতে ক্রমেই দুই নম্বর আসনটি অধিকার করতে যাচ্ছিল, অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের আসনটি চীন দখল করতে যাচ্ছিল আর রাশিয়া তিন নম্বরে চলে যাচ্ছিলো~
তবে এখন রাশিয়া ইউক্রেনে successful হলে আগামী শত বছরের জন্য আমেরিকার কাউন্টার-পার্ট হিসেবে রাশিয়ার আসন পাকাপোক্ত হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে চীন যতোই অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে যাক না কেন ?
তাছাড়া আমেরিকার আজ্ঞাবহ দেশ যেমন ৮/১০ টা আছে; রাশিয়ারও তেমনই বেলারুশ, ইউক্রেন(হতে যাচ্ছে), কাজাখস্তান, আলজেরিয়া, আর্মেনিয়া তৈরি হয়ে গেছে। জর্জিয়া'ও যে অনুরূপ রাষ্ট্রে পরিণত হবে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। তাছাড়া ভেনিজুয়েলা, ইরান, সিরিয়া ও উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার জন্য বাড়তি শক্তি । এছাড়াও ভারত ও চীনের রাশিয়ার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা ,সৌদি আরব/আরব আমিরাত ও পাকিস্তান সহ মুসলিম দেশ গুলির আমেরিকার সাথে বিমাতাসুলভ আচরণ করা এবং ন্যাটো সদস্যভুক্ত দেশ হয়েও তুরস্কের নিরপেক্ষ আচরণ করা যে; পুতিন বা রাশিয়া'র জন্য ভবিষ্যতে সুখকর বার্তা নিয়ে আসছে তাতে কোনোই সন্দেহ নেই~
কাজেই সন্দেহাতীত ভাবে বলা যায় যে রাশিয়া সঠিক পথেই এগুচ্ছে এবং বিশ্বরাজনীতিতে সাবেক সোভিয়েতে'র আসনে নতুন-ভাবে ও নতুন-নামে আসীন হতে যাচ্ছে ~
Comments
Post a Comment