Skip to main content

ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ব মোড়লদের লাভ/ক্ষতি :

 ইউক্রেন যুদ্ধ এবং  বিশ্ব মোড়লদের  লাভ/ক্ষতি : 


বলাই বাহুল্য; ইউক্রেন যুদ্ধ হটাৎ করে বেধে যাওয়া কোন যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও তদনুযায়ী নেয়া পদক্ষেপের ফসল এই যুদ্ধ~


ফিল্ড বা ময়দান হিসেবে ইউক্রেন ব্যবহৃত হলেও এই যুদ্ধে লিপ্ত মূলতঃ রাশিয়া ও ন্যাটো; আরও স্পেসিফিক ভাবে বলতে গেলে এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ মূলতঃ আমেরিকা ও রাশিয়া, কিন্তু যুদ্ধের ময়দান হচ্ছে ইউক্রেন। 

অনেকটা আগের দিনের যুদ্ধের মতো, যেখানে দুই পক্ষ ঘোষণা দিয়ে একটি ময়দানে যুদ্ধে লিপ্ত হতো~

আফসোস যে দুই পরাশক্তির বলি হচ্ছে শান্তিপ্রিয় এক জনগোষ্ঠী "নিরীহ ইউক্রেনিয়ান" ~


এই যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শুরু মাসখানেক আগে হলেও এর ক্ষেত্র তৈরীর কাজ শুরু হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই, বলাযায় সিরিয়ায় রাশিয়ার বাহিনী উপস্থিত হওয়ার পর থেকেইp~


স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একক শক্তি হিসেবে ইরাক, তিউনিশিয়া  ও লিবিয়া'য় সরকার পতন ঘটাতে আমেরিকার কোন বিরোধী শক্তির সম্মুখীন হতে না হলেও; সিরিয়াতে আমেরিকা প্রথম বাধার সম্মুখীন হয়।

আমরা সকলেই জানি, আমেরিকা সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি শুধুমাত্র রাশিয়ার কারণে~

আমেরিকা উপরে কিছু না বললেও, সিরিয়া ইস্যুতে ভিতরে ভিতরে স্নায়ুযুদ্ধ কালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকায় রাশিয়ার উত্থানে শঙ্কিত হয়ে পড়ে~

মূলতঃ সেখান থেকেই আমেরিকা রাশিয়াকে নতজানু করতে দীর্ঘমেয়াদি এক পরিকল্পনা হতে নেয় ~

বলাই বাহুল্য দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনা ও তদনুযায়ী নেয়া পদক্ষেপের ফসল এই ইউক্রেন যুদ্ধ ~


বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অবরোধের দ্বারা আমেরিকা যদি রাশিয়ার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ফেলতে পারে; তাহলেই আমেরিকার স্বার্থকতা; তাহলেই কেবল পরবর্তীতে বিশ্বপড়িমন্ডলে আমেরিকার কর্মকাণ্ডে রাশিয়া আর বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না~


তাছাড়া বিশ্বরাজনীতিতে যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় না থাকলে, অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া কোন কিছু করার থাকে না; যেহেতু বিশ্বের প্রথমসারির ১০ টি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে ৭ টি আমেরিকার, সেহেতু বিশ্বে সবসময় যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখতে আমেরিকার উপর একটি চাপ সবসময়ই থাকে এইসব কোম্পানি গুলোর পক্ষ হতে~


এই যুদ্ধের পিছনের কারিগররা অনেক দীর্ঘ মেয়াদী প্ল্যান ও প্রোগ্রাম নিয়ে এই যুদ্ধে নেমেছেন, কাজেই জেলেনোস্কির মত পুতুল রাষ্ট্র নায়কের হামকী/ধামকি আর সকাল বিকাল বিভিন্ন ধরনের কথাবর্তা বলা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই।

এখানে যেমন আমেরিকার অনেক হিসাব নিকাশ আছে, তেমনই রাশিয়ারও অনেক হিসাব নিকাশ আছে ~


বলা যেতে পারে~ এই যুদ্ধ শুধু মাত্র রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ নয়; বরং স্নায়ু-যুদ্ধ বা শীতল-যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর যুদ্ধ এটি; বিশ্বকে নতুনভাবে মেরুকরণের যুদ্ধ এটি~


সংগত কারণেই এই যুদ্ধের গতি প্রকৃতির দিকে সচেতন মহলের দৃষ্টি অতি তীক্ষ্ণ। 

এই যুদ্ধ এমন একটি যুদ্ধ; যেখানে হারজিতের মাধ্যমে ফয়সালা না হয়ে স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির ভিত্তিতে ফয়সালা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি~


যুদ্ধ শুরুর প্রারম্ভেই অস্ত্র ব্যবসার ঊর্ধ্বগতি এবং রাশিয়ার উপর একের পর অবরোধ আরোপে মনে হতে পারে যে আমেরিকার উদ্যেশ্য অনেকটাই সফল হতে চলেছে ~

তবে আমেরিকার চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে যদি রাশিয়া অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যায় এবং আমেরিকা'র আর কোন অভিযানে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে রাশিয়া ~

কিন্তু আদৌ কি সেটি সম্ভব ? এখন পর্যন্ত আরোপিত মার্কিন বলয়ের নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি কিছুটা সংকোচিত হলেও মুখ থুবড়ে পড়ার মত অবস্থা হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো পুতিনের নেওয়া কিছু কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আমেরিকার জন্য তা হিতে বিপরীত হতে পারে। যেমন সত্যি সত্যিই যদি ইউরোপ রাশিয়া হতে রুবলে তেল/গ্যাস কিনতে বাধ্য হয় এবং ইন্ডিয়া ও চীন রাশিয়ার সাথে ডলারের পরিবর্তে রুবল, রুপি এবং ইয়েনের মাধ্যমে ব্যবসা/বাণিজ্য শুরু করে, তাহলে কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যে আমেরিকার আধিপত্য অনেকটাই কমে আসবে। 

সেই সাথে সৌদি ও আমিরাতও যদি তেল ও গ্যাস বাণিজ্যে পেট্রোডলার এর পরিবর্তে অন্যান্য কারেন্সিতে বাণিজ্য করতে উদ্বুদ্ধ হয়, তাহলে তো রাশিয়া ও চীনের জন্য সোনায় সোহাগা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাবে~

তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ইউরোপের সাথে তেল ও গ্যাস বাণিজ্যে রাশিয়া রুবল'কে কতটুকু খাওয়াতে পারে এবং আরোপিত অবরোধকে কিভাবে মোকাবেলা করতে পারে, তার উপর ।


এছাড়াও ২০০৮ সালে জর্জিয়াতে সামরিক অভিযান পরিচালনা ও দুইটি প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল, ২০২০ সালে বেলারুশ আক্রমণ করে সেখানে রুশপন্থী সরকার কায়েম, এরপর কাজাখিস্থানে বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী প্রেরণ, এবছর ইউক্রেনের দনেতস্ক ও লুহানস্ক কে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান; এমন কি ইউক্রেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং দোনবাস (দনেতস্ক ও লুহানস্ক) ও মারিওপলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ; ইত্যাদি বিষয়গুলিকে একসুতায় গাথলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, যেকোন ভাবেই হোক না কেন রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধ কালীন সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থানে ফিরতে চায়। 


এক কথায় ইউক্রেন-যুদ্ধে রাশিয়া যদি ইউক্রেন হতে দোনবাস, মারিওপল এবং ক্রিমিয়াকে পাকাপাকি ভাবে আলাদা করতে সমর্থ হয় এবং অবরোধকে উপেক্ষা করে মাথা উচু করে টিকে থাকতে পারে ; তাহলেই রাশিয়া তার উদ্যেশ্য সাধনে ১০০% সফল হবে বলে বিশেষজ্ঞ গণ মনে করেন।


 এছাড়াও এ যুদ্ধে রাশিয়া বা পুতিনের জন্য আরেকটি বিষয় স্বস্তিদায়ক; সেটি হলো সোভিয়েত আমলের পুরনো অস্ত্রগুলো কৌশলে ইউক্রেনে ঢুকিয়ে দেয়া, বিশাল মেইনটেন্যান্স কস্ট এর হাত থেকে রাশিয়াকে উদ্ধারও বলা যেতে পারে এটিকে। আর কখনোই এগুলো যে রাশিয়াতে ব্যাক করবে না; একথা অনস্বীকার্য~


তবে রাশিয়া যদি  আমেরিকা ও ইউরোপ কর্তৃক আরোপিত অবরোধ মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়, তাহলে গত ১৫/২০ বছর যাবত অর্জিত  সকল সফলতা হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে রাশিয়ার~


এই যুদ্ধে ইউরোপের লাভ বলতে আমি কিছু দেখি না; এই যুদ্ধ যে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং বিশাল শরণার্থীদের পিছনে তাদের বাজেটের বিশাল একটি অংশ ব্যয় হবে; এক কথায় এই যুদ্ধের কারণে ইউরোপ কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাছাড়া রাশিয়া ও ইউক্রেন হতে সাপ্লাই পাওয়া তেল/গ্যাস ও খাদ্যের ক্রাইসিস যদি  আরও বৃদ্ধি পায়, তাহলে ইউরোপকে আরও অনেক বেশি মুল্যু দিতে হতে পারে ভবিষ্যতে~


বেচারা ইউক্রেনের কথা আর কি বলবো ? Infrastructure ধ্বংস হওয়া, আর ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হওয়া ছাড়া আমি তো আর কোন লাভ দেখি না ইউক্রেনের ?

Comments

Popular posts from this blog

সময়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের ধরন-ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও প্রয়োগিক পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না ?

 সময়ের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন হতে পারে বলে আমার অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা মনে করে থাকেন, এবিষয়ে আমার জানা ইসলামের আলোকে একান্ত বেক্তিগত মতামত~           আপনি বা আপনারা যদি ইসলামকে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম বলে বিশ্বাস করে থাকেন ; তাহলে আপনাদের এই ধারণা আল্লাহকে বা সৃষ্টিকর্তাকে ছোট বা খাটো করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ এমন একটি সত্তা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত বা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটবে, বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে যেসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে, সে-সব কিছুই তিনি অবগত ছিলেন এবং আছেন। কাজেই সময়ের সাথে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যদি ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ মনে করতেন, তাহলে উনি উনার বার্তাবাহক অর্থাৎ রাসূল মুহম্মদ সা: মারফত তা জানিয়ে দিতেন। উনি ভবিষ্যতের যেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন, মুহম্মদ সা: এর মাধ্যমে তা জানিয়ে দি...

মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?

 মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?  ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।  ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়) অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)  অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~ এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ? কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি। তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে। কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~ গালির সংজ্ঞা কী? "গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নি...

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...