#পোল্যান্ড :
এমন একটি অপয়া দেশ ¿¿
~ যেখান থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ।
~ যেখান থেকে স্নায়ুযুদ্ধ বা শীতল যুদ্ধ বা Cold War এর সূত্রপাত হয়েছিল।
~ যেখান থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার সূচনা হয়েছিল।
~ তাহলে কি এই পোল্যান্ড থেকেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হতে যাচ্ছে ?
১.
১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের আগে ১২৪ (কিছু কম/বেশি হতেপারে) বছর ধরে পোল্যান্ড নামক কোন দেশের অস্তিত্ব ছিল না। ১৭৯১ সালের দিকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া পোল্যান্ডকে অধিকার করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছিল।
১৯১৯ সালে প্যারিস শান্তি সম্মেলনের মাধ্যমে পোল্যান্ড ঐক্যবদ্ধ রূপ পায়, অর্থাৎ পুনরায় পোল্যান্ড রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু পোল্যান্ডের এই অখন্ড রূপ স্থায়ী ছিল মাত্র ২০ বছর। হিটলার পোল্যান্ডের অদূরে জার্মান অধ্যুষিত "ডানজিগ" বন্দরে যাতায়াত করার জন্য পোল্যান্ডের ভিতর দিয়ে একটি করিডোর দাবি করে, কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্সের পরামর্শে পোল্যান্ড সেই করিডোর দিতে অস্বীকার করে। মূলতঃ এই কারণ দেখিয়ে হিটলার ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণ করে বসে । প্রথম দিনেই পোল্যান্ডের পতন ঘটে এবং হিটলার পোল্যান্ড দখলে নেয়।
কিন্তু এর ২ দিন পর অর্থাৎ ৩রা সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডের হয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। মূলতঃ এখান থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।
উল্লেখ্য: ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির এই ত্রিপক্ষীয় যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগে ১৭ সেপ্টেম্বর রুশ বাহিনী এক ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে পুনরায় পোল্যান্ডের পূর্ব অংশ দখল করে নেয়। অবশ্য হিটলারের পতন ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, পোল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রণাধীন এক রাজ্য "কমিউনিস্ট পিপলস রিপাবলিক পোল্যান্ড" হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
২.
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যবস্থা দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পরে~
এই বিভক্তিজনিত উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে জার্মানিকে কেন্দ্র করে;" পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি কে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এর দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এহেন পরিস্থিতিতে আমেরিকা তার প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়ানোর উদ্যেশ্যে ১২ টি দেশের সমন্বয়ে ৪ এপ্রিল, ১৯৪৯ সালে "উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট" বা ন্যাটো গঠন করলেও, উত্তেজনা যাতে যুদ্ধে রূপ না নেয় সেজন্য শুরুতে পশ্চিম জার্মানিকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করে নি আমেরিকা। তবে ১৯৫৪ সালের প্যারিস সম্মেলন এবং ১৯৫৫ সালের লন্ডন সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক পশ্চিম জার্মানি ন্যাটো তে অন্তর্ভুক্ত হলে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোল্যান্ডের উদ্যোগে ১৪ মে ১৯৫৫ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী "ওয়ারশ" শহরে কেন্দ্রীয় ও পূর্ব ইউরোপের আটটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত হয় "সম্মিলিত প্রতিরক্ষা চুক্তি" যা ওয়ারশ চুক্তি নামে পরিচিত এবং যাকে "ওয়ারপ্যাক" নামে ডাকা হতো । এই জোটের সদরদপ্তরও পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরে ছিল ।
মূলতঃ এই ওয়ারশ চুক্তি বা ওয়ারপ্যক জোট গঠিত হওয়ার পর বিশ্বে যেমন শক্তির ভারসাম্য আসে, তেমনি পুরোদমে স্নায়ুযুদ্ধ বা শিতলযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় । ফলশ্রুতিতে বহুবার মুখোমুখি হওয়া সত্বেও ন্যাটো এবং ওয়ারপ্যাক/ওয়ার'শ সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও বিশ্বব্যাপী প্রক্সিযুদ্ধে লিপ্ত ছিল সর্বসময়।
৩.
মিখাইল গর্ভাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতায় আসার পর নাগরিকদের কিছু অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির লাগাম টেনে ধরেছিলেন, কারণ ততদিনে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা দুর্নীতি ও সেচ্ছাচারীতায় সমস্ত রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলেছিলেন; ফলস্বরূপ কমিউনিস্ট শাসনাধীন দেশ সমূহের, বিশেষ করে সোভিয়েত রাশিয়ার জনগণের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল । তবে তিনি হয়তো কখনোই ভাবতে পারেন নি যে তার এই উদারতার জন্য পোল্যান্ড থেকে কমিউনিজমের বিদায়ঘণ্টা বাজা শুরু হবে এবং শেষপর্যন্ত তা সোভিয়েত ইউনিয়নকেও তছনছ করে দিবে ?
১৯৮৯ সালে গর্বাচেভ এক নতুন সামরিক নীতি ঘোষণা করেন, যে সামরিক নীতিতে বলা ছিলো~
পূর্ব ইউরোপের স্যাটেলাইট দেশগুলো সোভিয়েত বলয় থেকে বের হয়ে যেতে চাইলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই দেশগুলোতে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে না।
এর কিছুদিন পরই পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট বিরোধী ট্রেড ইউনিয়নবাদীরা কমিউনিস্ট সরকারকে স্বচ্ছ নির্বাচন প্রদানে বাধ্য করে। ১৯৮৯ সালের ৪ঠা জুন এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং পোল্যান্ড থেকে কমিউনিজম বিদায় নেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ মার্চ ,১৯৯০ পূর্ব জার্মানিতে প্রথম মুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । এরপর পূর্ব এবং পশ্চিম অংশ আলোচনার মাধ্যমে পুনঃএকত্রিকরণের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছায় । অতঃপর জার্মান পুনঃএকত্রিকরণ সম্পন্ন হয় ১৯৯০ সালের ১৩ অক্টবর । এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রি জার্মানি(পূর্ব জার্মানি)র অঞ্চল সমূহ ফেডারেল প্রজাতন্ত্রি জার্মানি(পশ্চিম জার্মানি)র সাথে একীভূত হয়। পরবর্তীতে একীভূত জার্মানি ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর সদস্য হয়।
মূলতঃ জার্মানির একীভূত হওয়ার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি বিশ্ববাসীর কাছে উন্মুক্ত হয়ে যায়।
যাইহোক; পোল্যান্ড ও জার্মানি থেকে কমিউনিজমের বিদায়ের ধারাবাহিকতায় এরপর চেকোস্লোভাকিয়ায় 'ভেলভেট ডিভোর্স' বিপ্লবের মাধ্যমে সেখানকার কমিউনিস্ট সরকারকে উৎখাত করা হয়।
এরপর রোমানিয়ার গণতন্ত্র পন্থীরা বিদ্রোহের মাধ্যমে রোমানিয়ার কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক নিকোলাই সিউসেস্কু এবং তার স্ত্রী এলেনাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং রোমানিয়া থেকেও কমিউনিজম বিদায় নেয়।
১৯৮৯ সালে পোল্যান্ড থেকেশুরু হওয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব এবং পরবর্তীতে সোভিয়েত বলয়াধিন অন্যান্য দেশ গুলিতে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য প্রজাতন্ত্রগুলোকে উৎসাহিত করে স্বাধীনতার দাবি তুলতে।
পোল্যান্ড সহ জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া ও রোমানিয়ার বিপ্লবগুলোর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার আন্তর্জাতিক প্রভাব হারায়। আন্তর্জাতিক অনাস্থা ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ অনাস্থায় রূপ নেয়। এর রেশ ধরেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রজাতন্ত্র স্বাধীনতা দাবির সাহস করে।
এককথায় এই বিপ্লবগুলোই সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের সূত্রপাত ঘটায়; যার শুরুটা পোল্যান্ড থেকেই হয়েছিল~
এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ এর সূত্রপাত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এর যবনিকাপাত এর সাথে পোল্যান্ড কোনো না কোন ভাবে যুক্ত আছে~
বর্তমানে ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধে পোল্যান্ড এর ভূমিকা বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক দের মনে সংগত কারণেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে ~
তাহলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি পোল্যান্ড থেকেই শুরু হতে যাচ্ছে ?
উত্তর: আরেকদিন ~ (যদি মন চায় )
৪. ....... .....
Comments
Post a Comment