#মহানায়কের_মহানয়কচিত_প্রত্যাবর্তন:
পাকিস্তানের কারাগারে ২৯০ দিন থাকার পর ১৯৭২ সালের এদিন বেলা ১টা ৪১ মিনিটে মহানায়ক মহানয়কচিতভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। প্রত্যাবর্তন পরবর্তী ঘটনা অনেকাংশে অনেকেই জানি, কাজেই প্রত্যাবর্তন পূর্ববর্তী ২৯০ দিনের ঘটনা প্রবাহ থেকে কিয়দংশ উল্লেখ করছি~
পাক হানাদাররা মহানায়ককে ২৫ মার্চ রাতেই তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁকে প্রথমে এ্যাসেম্বলি বিল্ডিং-এ, পরে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি স্কুলের অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। ছয় দিন ধরে তিনি বন্দী ছিলেন সেই ঘরে। ১ এপ্রিল তাকে রাওয়ালপিন্ডি, পরে মিয়ানওয়ালী জেলে। এসময় মহানায়ককে মহাবিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখা হয়। পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্য ছিলো, উনাকে ভয় দেখিয়ে আপোষ করতে বাধ্য করা ও তাঁর মুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে মীমাংসায় আসতে চাপ দেয়া। মীমাংসা না হলে প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়া।
অতঃপর শুরু হয় প্রহসনের বিচার কার্যক্রম, মহানায়ক বিষয়টি বুঝতে পেরে কোন আইনজীবী নিয়োগ দেন নি।
পাকিস্তান সরকার নিজেই উদ্যোগী হয়ে আইনজীবী এ কে ব্রোহিকে নিয়োগ দেয় মহানায়কের আইনজীবী হিসেবে। বিচারিক রায় আগে থেকেই ঠিকঠাক ছিল, বিধায় মহানায়ক কর্তৃপক্ষকে তার লাশটি যেন বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হয় মর্মে জানিয়ে রাখেন।
এমনও ঘটনা ঘটেছে মহানায়ক_কে মানসিক চাপে ফেলার জন্য জেলখানার সেলের পাশে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া হয়েছিল।
১৫ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান মহানায়কের ফাঁসির আদেশ কার্যকরের আদেশ দেন। ইতিমধ্যে পূর্বপাকিস্তানে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের উত্তেজনা আর দৌড়ঝাপের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ কার্যকর করতে দেরি হয়ে যায়। এই সুযোগে ওই জেলখানার জেলার মহানায়ককে জেলখানা থেকে সরিয়ে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রাখেন। সেখান থেকে তাঁকে চাশমা ব্যারেজ কলোনিতে সরিয়ে নিয়ে যান।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট হন জুলফিকার আলি ভুট্টো।
ভুট্টো বুঝতে পেরেছিলেন মহানায়কের কিছু হলে বাংলাদেশে বন্দী পাকিস্তানি সৈন্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের অনুগতরা সেখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পারবে না। সেকারণেই ভুট্টো ১৯ ডিসেম্বর মহানিয়কের সাথে রাওয়ালপিন্ডিতে সাক্ষাৎ করেন।
প্রথম সাক্ষাতেই মহানায়ক ভুট্টোকে বলেন, ‘আমি মুক্ত কিনা বলুন’। ভুট্টো বললেন, ‘আপনি মুক্ত । এসময় ভুট্টো মহানায়ককে বলছিলেন, 'পাকিস্তানের ‘দুই অংশ এখনও আইন আর ঐতিহ্য দিয়ে যুক্ত' --- ___ ---- এসময় মহানায়ক উনাকে থামিয়ে দিয়ে বলেন~ ~
‘গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, যদি পাকিস্তান এখনও একটি দেশ হয়ে থাকে, তাহলে আপনি প্রেসিডেন্ট নন, সেটা আমি। ’
২৬ ডিসেম্বর মহানায়ককে কলোনি থেকে হেলিকপ্টারে করে সিহালা অতিথি ভবনে নিয়ে আসা হয়। পরের দিন ভুট্টো সেখানে এসে উনার সাথে দেখা করেন এবং তাঁকে মুক্তির সংবাদ দেন।
৫ জানুয়ারি, ১৯৭২ প্রেসিডেন্ট ভুট্টো উনার সঙ্গে তৃতীয় আর শেষবারের মতো দেখা করতে যান। মহানায়ক তখন ভুট্টোকে বললেন, ‘আপনি অবশ্যই আমাকে আজকে রাতে মুক্তি দেবেন। আর দেরি করার কোন জায়গা নেই। হয় আমাকে মুক্ত করুণ নয় হত্যা করুন। ’ ভুট্টো ৭ জানুয়ারি রাত তিনটার সময় উনাকে লন্ডনের উদ্দেশে বিমানে তুলে দেন। পরদিন সকাল সাড়ে ছয়টায় মহানায়ক এসে পৌঁছান লন্ডনের হিথরো বিমান বন্দরে। হিথরো বিমান বন্দরে এই মহানায়ককে বীরোচিত মর্যাদা দেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের বিরোধীদলের প্রধান এসময় মহানায়ককে মি: প্রেসিডেন্ট বলে সম্মধন করেন। এদিন রাতে অনানুষ্ঠানিক মিটিং ও নৈশভোজে যোগদানের জন্য মহানায়ক কে বহনকারী গাড়ি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পৌঁছলে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিয়ম বহির্ভূত ভাবে নিজে এসে গাড়ির দরজা খুলে দেন, অতঃপর বিদায় মুহূর্তেও উনি নিজহাতে মহানায়কের গাড়ির দরজা খুলে দাড়িয়ে থাকেন মহানায়ক গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত। এ ঘটনা সেসময় সারাবিশ্বে প্রচন্ড আলোড়ন তুলেছিল, আমেরিকা লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছিল, পার্লামেন্টে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এর জবাব দিতে হয়েছিল। জবাবে তিনি বলেছিলেন ~ "এভাবে বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানিয়ে শুধু আমি নিজেকে নই, পুরো ব্রিটিশদের সম্মানিত করেছি।"
এরপর ইন্ডিয়া হয়ে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি সহকারে মহানায়কের বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তনের কাহিনীর অনেকাংশই আমরা অনেকে জানি, বিধায় অনুল্লেখ্যই রেখে দিলাম~
Comments
Post a Comment