খোলা চিঠি~
প্রিয় ইউরোপিয়ান ভাই/বোন/বন্ধুগন;
গত দুইদিন হলো আপনাদের মিডিয়ায় একটি কথা বার বার বলা হচ্ছে, তা হলো ইউক্রেনকে পরিকল্পিত ভাবে সিরিয়া বানানো হচ্ছে । রাশিয়া যেভাবে ইউক্রেনের একের পর এক শহর ও বন্দরগুলি ধ্বংস করে চলেছে, তাতে আপনাদের উপলব্ধি হচ্ছে যে ইউক্রেনের পরিণতি সিরিয়ার দিকেই যাচ্ছে। অর্থাৎ আপনারা স্বীকার করে নিচ্ছেন যে সিরিয়ার শহর, বন্দরসহ অবকাঠমোগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে ।
বলতে পারেন সিরিয়ার এই পরিণতি কারা করেছে ? কাদের হাত দিয়ে সিরিয়ার শহর/বন্দর গুলি একের পর এক ধ্বংস হয়েছে ?
বলা হয়, যুদ্ধের বিভীষিকায় পড়ে সিরিয়ার জাতীয় সম্পদ ও অবকাঠামো প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত হয়েছে ৪ লাখ ৭০ হাজার লোক, বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৪৫ শতাংশ সিরীয়। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।,
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাকল্যে সিরিয়ার জনগণের সাড়ে ১১ শতাংশই নিহত বা আহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট করে আহত ব্যক্তির সংখ্যা বলা হয়েছে ১৯ লাখ। যুদ্ধ শুরুর আগে ২০১০ সালে সিরিয়ার মানুষের গড় আয়ু যেখানে ছিল ৭০ বছর, সেটাই ২০১৫ সালে নেমে দাঁড়ায় ৫৫ বছর ৪ মাসে। দেশটির অর্থনীতির সার্বিক ক্ষতির পরিমাণও নিতান্ত কম নয়, আনুমানিক ২৫ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
এসসিপিআরের মতে, নিহত ৪ লাখ ৭০ হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৪ লাখই মারা গেছে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ সহিংসতার শিকার হয়ে। বাকি ৭০ হাজার মারা গেছে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের ঘাটতিতে, সংক্রামক ব্যাধিতে, খাবার ও পানির অভাবে। পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা ও নিরাপদ থাকার স্থানের অভাবও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
এই প্রতিবেদনের মূল রচয়িতা রাবি নাসের, যিনি গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘যথাযথ পদ্ধতি অবলম্বন করে এই গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তাই নিহত বা আহত ব্যক্তিদের সংখ্যার ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। ভবিষ্যতে পরোক্ষভাবে মৃত্যুর হার আরও বাড়বে।
২০১১ সালের মার্চ মাসে 'আরব বসন্ত ' নাম দিয়ে কিছু মানুষকে উস্কে দিয়ে; অতঃপর আমেরিকা ও আপনাদের(ইউরোপের) দেশ গুলির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আগ্রাসনে সিরিয়া নামক এক সমৃদ্ধ দেশের আজকে এই পরিণতি।
আমরা যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত; ১৯৭১ সালে আপনাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে আমরা ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণ হারিয়েছি, আহত ও অবকাঠামো ধ্বংসের হিসাব বলে শেষ করা যাবে না।
একারণেই আমরা সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন ইত্যাদি দেশে আপনাদের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারি, বুঝতে পারি একজন পিতার মৃত্যুতে পরিবারের কি হাল হয় ? একজন মাতা বা বোন ধর্ষনের স্বীকার হলে উক্ত পরিবারের কি অবস্থা হয় ? অতি আদরের শিশু সন্তান নিহত হলে বাবা/মা'র কেমন লাগে ?
শহরের দালানকোঠা এর কথা বাদই দিলাম; আমাদের গ্রামের পর গ্রাম আগ্রাসন কারীরা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল, আমরা জানি সিরিয়া/ইরাক/লেবানন/ইয়েমেন সহ প্রতিটা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের বাড়িঘর, হাসপাতাল সহ অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে সাধারণ মানুষের কি পরিমাণ ভোগান্তি হয়, আমরা ইউক্রেন বাসীদের দুর্ভোগও অনুভব বা অনুধাবন করতে পারি, কারণ আমরা ভুক্তভুগী।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্যি যে আপনারা এতদিন তা বুঝতেন না বা জানতেন না, অনুভব করতো দূরে থাকুক!!! কারণ আপনারা ভুক্তভোগী নন, আপনারা আগ্রাসী বা আগ্রাসন কারী। কিছু সংখক সৈন্যের নিহত বা আহত হওয়া ছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে বাস্তবিক অর্থে আপনাদের তেমন কোন ধারণা ছিল না। পরিবারের একজন নিহত বা আহত হলে, প্রিয় শিশুর মৃত্যু হলে, মা/বোন ধর্ষিতা হলে উক্ত পরিবারের অবস্থা কি হয়, তা আপনারা জানতেন না, বুঝতেন না, অনুধাবন করতে পারতেন না।
এক সিরিয়ায় এপর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ভাবে ৭০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন এবং ৪০ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। ইরাক, ইয়েমেন, লেবানন, ফিলিস্তিন, লিবিয়া ও আফগানিস্তানের কথা না হয় বাদই দিলাম।
এ পর্যন্ত ইউক্রেনে ১০/১২ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়েছে বিধায় হয়তো বাস্তুচ্যুত/গৃহহীন/শরণার্থী মানুষের দুর্দশা কিছুটা বুঝতে পারছেন ?
আমাদের বাংলাদেশের এরকম প্রায় এক কোটির উপর মানুষ শরণার্থী হয়ে ইন্ডিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল, এই কারণে আমরা সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, ইরাকসহ বিশ্বের সমস্ত যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের শরণার্থী হওয়া মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আমরা বুঝতে পারি, অনুভব করতে পারি, এমনকি ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও আমরা তা বুঝতে পারি এবং অনুভব করতে পারি।
মূলতঃ একারণেই আমাদের সীমিত সামর্থের মধ্যেও আমরা পার্শ্ববর্তী দেশের অত্যাচারিত ১৪/১৫ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছি।
ইউক্রেনিয়ানরা তো অনেক সৌভাগ্যবান, আপনারা তাদের সাদরে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন, হাসপাতালের ব্যবস্থা করেছেন, নিজ বাড়ির মতোই থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করেছেন তাদের জন্য।
কিন্তু একবার ভেবে দেখেন তো সিরীয়, লেবানিজ, ইরাকী, ইয়েমেনি ও আফগান শরণার্থীদের কথা ? তাদেরকে আপনারা সীমান্তে ঢুকতে দেন নি, শীতের কষ্ট জমে অনেককে মরতে হয়েছে, এদের অনেককে বহনকারী ডিঙ্গি নৌকা কে আপনারা উপকূলে ভিড়তে দেন নি, কোনমতে যারাও বা আপনাদের দেশে ঢুকতে পেরেছে তাদের কতটুকু আদর ও আপ্যায়ন করেছেন আপনারা ? সেটা সাদা চামড়া, নীল চোখ ও বাদামি চুলের অধিকারী ইউক্রেনিয়ান শরণার্থীদের সাথে মিলিয়ে দেখবেন কি ? প্লিজ।
আমাদের কথায় মনে হতে পারে, যুদ্ধে আমরা ইউক্রেনের বিপক্ষে বা রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি~
কিন্তু তা নয়; আমরা বরাবরই যেকোন যুদ্ধের বিপক্ষে, কিন্তু আমরা চাই আপনারা যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানুন, বুঝুন এবং অনুধাবন করতে শিখুন~
কারণ গত ৭০ বছর যাবত আপনারা একের পর এক আমাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন, আমাদের হত্যা করেছেন, ধর্ষণ করেছেন, আবাসস্থল সহ আমাদের অবকাঠামো গুলো ধ্বংস করেছেন ।
যুক্তি হিসেবে বলেছেন আমরা বর্বর, অশিক্ষিত, উগ্রবাদী, মৌলবাদী অথবা সন্ত্রাসী।
কারণ আমরা বাদামি বা কৃষ্ণ বর্ণের মানুষ, আপনাদের ভাষায় অসভ্য ও অশিক্ষিত মানুষ~
তারপরেও কিন্তু আমরা মানুষ !?? আপনাদের মত আমাদেরও দুঃখ/বেদনা ও কষ্টের অনুভূতি আছে, আনন্দে কিন্তু আপনাদের মত আমরাও হাসি, কষ্টে কিন্তু আমরাও কাদি~
এখনও আপনাদের মধ্যে যে বর্ণবৈষম্য মূলক আচরণ দেখতে পাচ্ছি আমরা ? তাতে মনে হয় যুদ্ধ ততদিন পর্যন্ত স্থায়ী হোক যতদিন পর্যন্ত আপনাদের বোধোদয় না হয়~
কিন্তু মন চাইলেও বাস্তবিক অর্থে আমরা তা চাই না, আমরা চাই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেন নয়; পৃথিবী থেকেই চিরতরে বিদায় হোক~চিরদিনের-জন্য~
ভুক্তভুগী এক দেশের নাগরিক~
আজিজ মিশির সেলিম।
Comments
Post a Comment