ইসলাম ও হিন্দু ধর্মে "টিপ" আসলে কতটুকু গুরুত্ব বহন করে?
গতকাল দেখলাম একজন পুলিশ তাদের ভেরিফায়েড পেইজে টিপ সংক্রান্ত বিশধ বিবরণ ছেপেছেন, এছাড়াও বেশ কয়েকজনকে ফেসবুক পেইজে একই বিষয় নিয়ে লিখতে দেখেছি, যারা ইসলাম ধর্মমতে টিপকে নিষিদ্ধ প্রমাণ করতে ইব্রাহিম (আ:) এর সময়কার একটি ঘটনাকে সামনে এনেছেন।
আমি আবার আমার কয়েকজন হিন্দু বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম, যারা টিপকে তাদের ধর্মীয় বিষয় মনে করেন~
আমরা অধিকাংশ মুসলিম এবং হিন্দুই ধর্মাবলম্বীরা-ই উত্তরাধিকার সূত্রে মুসলমান এবং হিন্দু। ধর্ম সম্পর্কে আমাদের যতটুকু জ্ঞান, তার অধিকাংশই উত্তরাধিকার সূত্রে মুখে মুখে পাওয়া । সঙ্গত কারণেই মুখে মুখে প্রাপ্ত জ্ঞানের মধ্যে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে~
ইসলাম ধর্মমতে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত চারটি প্রসিদ্ধ ধর্ম ~
১) মুসা(আ:) এর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম, যার ধর্মগ্রন্থের নাম তাওরাত এবং যার অনুসারীরা বর্তমানে ইহুদি নামে পরিচিত~
২) দাউদ (আ:) এর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম, যার ধর্মগ্রন্থের নাম জবুর~
৩) ঈসা (আ:) এর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম, যার ধর্মগ্রন্থের নাম ইঞ্জিল এবং অনুসারীরা বর্তমানে খৃষ্টান নামে পরিচিত~
৪) সর্বশেষ মুহম্মদ (সা:) এর মাধ্যমে প্রেরিত ধর্ম, যার ধর্মগ্রন্থের নাম কোরআন এবং অনুসারীরা বর্তমানে মুসলিম নামে পরিচিত। সর্বশেষ এই ধর্মকেই ইসলাম ধর্ম বলা হয়।
ইসলাম ধর্মমতে, সৃষ্টিকর্তা তখনই একটি নতুন ধর্মকে মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেছেন, যখন পূর্বে উনার-ই প্রেরিত ধর্ম মানুষ কর্তৃক বিবর্তনের বা পরিবর্তনের কারণে তার মৌলিকত্ব হারিয়েছে~
এককথায়; ইসলাম ধর্মমতে~
সৃষ্টিকর্তা হযরত মুহম্মদ (সা:) এর মাধ্যমে প্রেরিত বর্তমান ইসলাম ধর্ম প্রেরণের প্রাক্কালে উপরুলেখিত প্রথম তিনটি ধর্মসহ পূর্বের সকল ধর্মকে বাতিল করে দিয়েছেন ।
অর্থাৎ পূর্বের ধর্মেসমূহের সমস্ত নিয়ম-কানুন ও আচার-অনুষ্ঠান বর্তমান ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের কারণে রোহিত হয়ে গিয়েছে, সেসবের আর কোন কার্যকারিতা বর্তমানে নেই।
সেই সূত্রে বলাযায়, ইব্রাহিম (আ:) কর্তৃক প্রচারিত ধর্মসহ সমস্ত ধর্ম এবং সেসব ধর্মীয় আচার ,অনুষ্ঠানে'র বর্তমানে কোন কার্যকারিতা নেই~
তাহলে ইব্রাহিম (আ:) এর সময়ে টিপ দ্বারা কি বুঝানো হতো বা না হতো, তার কোন গুরুত্ব বর্তমান ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী আছে কি ?
দেখতে হবে ইসলাম ধর্মের বার্তাবাহক মুহম্মদ (সা:) এসংক্রান্ত কোন দিকনির্দেশনা দিয়েছেন কি না ?
যুক্তির খাতিরে-ই বলা যায় যে, টিপ নিয়ে মুহম্মদ সা: এর পক্ষথেকে কিছু বলা নেই, যদি থাকতো তাহলে এতদিনে তা প্রকাশ্যে চলে আসর কথা ছিল, সেক্ষেত্রে বিভেদ,-সৃষ্টিকারী'দের ইব্রাহিম (আ:) এর ঘটনা নিয়ে টানাটানি করার প্রয়োজন পড়ত না~
অতএব একথা অনস্বীকার্য যে, টিপ ইস্যুতে বর্তমান ইসলাম ধর্মের নামে ইব্রাহিম (আ:) এর ঘটনা নিয়ে টানাটানি করাটা সাধারণ মুসলিমদের মিসগাইড করে দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর চেষ্টা ব্যতীত আর কিছুই নয়~
তবে ইসলাম ধর্মমতে ইব্রাহিম (আ:), মুসা (আ:), দাউদ (আ;) ও ঈসা/যিশু (আ:) সহ সমস্ত নবী/রাসূল(যাদের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তা ধর্ম প্রচার করেছেন) গণকে যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান করা হয়, এবং উনাদের বিশেষ বিশেষ ঘটনাকে মানব জাতির হেদায়েতের জন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পবিত্র কোরআনে এরূপ অসংখ্য ঘটনার বিবরণ আছে, কিন্তু তাদের রীতি-নীতি ও আচার/অনুষ্ঠানকে পালন করতে বলা হয় নি। একমাত্র মুহম্মদ (সা:) কর্তৃক প্রচারিত ও প্রবর্তিত রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানকেই পালন করতে বলা হয়েছে।
টিপ হিন্দু ধর্মের কোন অনুষঙ্গ কি না ?
আজ থেকে প্রায় ৯৫০০~১১৫০০ বছর আগে, যাকে বাল্মীকি যুগ বলে বর্ণনা করা হয়ে থাকে, তখন থেকে হিন্দুদের মধ্যে তিলক পড়ার প্রচলন শুরু হয়~
উচ্চ শ্রেণীর ব্রাহ্মণগণ তখন থেকে কপালে সাদা তিলক (চন্দন তিলক) দিয়ে থাকেন।
ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধা শ্রেণীর হিন্দুরা সাহসের প্রতীক হিসেবে কপালে লাল তিলক দিয়ে থাকেন।
ব্যবসায়ী শ্রেণীর হিন্দুরা কপালে হলুদ তিলক দিয়ে থাকেন।
আর নিচু শ্রেণীর হিন্দুরা কপালে কালো তিলক ধারণ করেন।
তবে এই ধরনের তিলক সাধারণত হিন্দুদের মধ্যে পুরুষ শ্রেণীকেই ব্যবহার করতে দেখা যায়, বর্তমানে তাও কদাচিৎ, আগের মত নয়।
তাছাড়া এই তিলক আর মহিলাদের ব্যবহৃত টিপ একই জিনিস কিনা, সেটি আমার জানা নেই ~
তবে, একাগ্রচিত্তে ধ্যান করার জন্য হিন্দু নারীপুরুষেরা একসময় দুই ভ্রুর মাঝে তিলক বা টিপ পড়তেন, যাকে ধ্যানবিন্দু বলা হতো। দুই ভ্রুর মাঝখানে মনকে স্থির করা বা স্থিতি অবস্থায় আনার জন্য এই তিলক পরা হতো।
হিন্দুধর্মে নারীর সাধারন গৃহকর্ম এবং পরিজন ও অতিথীদের সেবাকে তপস্যার তুল্য গন্য করা হতো সেসময়, একজন গৃহিনী একাগ্র-মনে তার কাজ করেন, যা কিনা সন্ন্যাস জীবনে ধ্যানের সমতুল ৷ নারীকে সর্বদা একাগ্রতায় স্থির রাখা এবং সমগ্র গৃহস্থ জীবনকে উচ্চতর চেতনার দৃষ্টিতে পরিচালনা করার জন্যই তখন দুই ভ্রুর মাঝে তিলক বা টিপ পরার প্রথা চালু ছিল ।
এছাড়াও একসময় হিন্দু মহিলাদের দেবদেবীর উদ্যেশ্যে উৎসর্গ করার সময়ও টিপ পড়ানোর প্রচলন ছিল। এছাড়াও হিন্দু দেবদেবীদের প্রতিমাগুলোর কপালেও টিপ পড়ানোর প্রচলন দেখা যায়, তবে সেই টিপ দেবদেবীর সৌন্দর্য্যবর্ধন এর জন্যই পড়ানো হয় বলে আমার ধারণা (ভূলও হতে পারে)
এরকম হয়তঃ টিপ সংক্রান্ত আরও অনেক অনুষঙ্গ হিন্দু ধর্মে থাকতে পারে যা আমার জানা নেই~
একথা অনস্বীকার্য যে, হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন প-র-তে একসময় টিপের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, হয়তঃ কিছু ধর্মভীরু হিন্দুদের কাছে এখনো টিপের সেরকম গুরুত্ব থাকতে পারে~
তবে, হিন্দু মহিলারা গৃহস্থালির কাজকে তপস্যা হিসেবে গ্রহণকরে দুই ভ্রুর মাঝখানে তিলক বা টিপ পড়তো হয়তো সেই কলি যুগের শুরুতে বা তারও পূর্বে দ্বাপর যুগে, বর্তমান যুগে যে হিন্দু মহিলারা সৌন্দর্য চর্চার উদ্যেশ্যে-ই টিপ ব্যবহার করে তাতে কোনই সন্দেহ নেই।
তদরুপ বাঙ্গালী মুসলিম/বৌদ্ধ/খিস্টান মহিলারাও টিপ ব্যবহার করে সৌন্দর্য চর্চার উদ্যেশ্যেই ।
আমার মতে ~
বর্তমানে "টিপ" বাঙ্গালী মহিলাদের জন্য সৌন্দর্য চর্চার একটি অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ এবং বাঙ্গালী সংস্কৃতির একটি অংশ; সেটির উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক না কেন ? হতে পারে তা হিন্দু ধর্ম থেকে~
হিন্দুরা টিপ পড়লে কি মুসলিমরা টিপ পড়তে পারবে না ? তাহলে তো হিন্দুরা ভাত খায় বলে আমাদের ভাত খাওয়া ছেড়ে দেওয়া উচিত, বা হিন্দু মহিলারা শাড়ি পরে বিধায় মুসলিম মহিলাদের শাড়ি পড়া ছেড়ে দেওয়া উচিৎ ,,, ইত্যাদি অনেককিছুই বাদ দেয়া উচিৎ তাহলে ?
বলতে বাধা নেই যে, অধিকাংশ বাঙ্গালীই আমার মত একই ধারণা পোষণ করেন~
তবে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এর মতে, ''আঠারো বা উনিশ শতকের আগে অনেক সময় টিপ কে উপমহাদেশের নারীদের শ্রেণি ও মর্যাদার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এরপর থেকে টিপ সবার কাছে সাধারণ সৌন্দর্য চর্চার একটি উপাদানে পরিণত হয়েছে।
বলতে বাধা নেই; বঙ্গদেশীয় কিছু মুসলিম আরব দেশীয় সংস্কৃতিকে ইসলামিক সংস্কৃতি বলে মনে করে, যা মোটেও সঠিক নয় । ইসলামে সবকিছুই স্পষ্টভাবে বলা আছে, সমস্ত নিয়ম/কানুন ও আদেশ/নিষেধ স্পষ্ট করেই বলা আছে । ইসলাম পালনের জন্য ইসলামকেই অনুসরণ করা উচিত, কোন জাতি বা গোত্র'কে নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে~
আরব দেশের পোশাক জুব্বা ও ছালোয়ার'কে ইসলামী পোশাক হিসেবে উপমহাদেশীয় মুসলিমদের গ্রহণ করা।
অথচ ইসলামে স্পষ্টভাবে পোশাক সম্পর্কে বলা হয়েছে ইবাদতের সুবিধার্তে ঢিলেঢালা পোশাক পরিধান করতে, লুঙ্গি/শার্টও ঢিলেঢালা হতে পারে, প্যান্ট/শার্টও ঢিলেঢালা হতে পারে, মূলতঃ "জাকির নায়েক" একারণেই ঢিলেঢালা প্যান্ট/শার্ট পরে ইসলামের প্রচার প্রচারণা করে থাকেন, জুব্বা/ছালোয়ার পড়ার বিষয়ে ইসলামে কোন বিধান নেই। এরকম উদাহরণ আরও অনেক আছে~
এরূপ ধারণা থেকে হয়তঃ আরব দেশের মহিলাদের টিপ না পড়ার কারণে এদেশীয় অনেক মুসলমান ভাবতে পারে যে, টিপ পরা মনে হয় নিষিদ্ধ ।
তাদের জ্ঞাতার্থে সবিনয়ে বলতে চাই যে, টিপ এরাবিক সংস্কৃতির অংশ নয়, এটি বাঙ্গালী সংস্কৃতির অংশ।
* হিন্দু/মুসলিম সকল ভাইবোনদের কাছেই অনুরোধ~
টিপ নিয়ে আর টেপাটিপি করিয়েন না🤔প্লিজ~
* টিপকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিভাজন তৈরী করিয়েন না , প্লিজ~
* ধর্মের উর্ধ্বে উঠে টিপকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ভাবুন, প্লিজ~
* টিপ ও শাড়ি ব্যতীত বাঙ্গালী মেয়েদের সৌন্দর্য কতটুকু ফুটে ওঠে ? পুরুষের দৃষ্টিতে একবার ভেবে দেখুন 😇প্লিজ~
Comments
Post a Comment