রমজান: মুসলিমরা যে একমাস ধরে রোজা রাখেন, সেটা তাদের শরীরে কী প্রভাব ফেলে?
প্রতি বছর কোটি কোটি মুসলমান রোজা রাখেন, সূর্যোদয় হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহারে বিরত থেকেন।ইউরোপের কোন কোন দেশে কুড়ি ঘণ্টাও রোজা রাখতে হয়।
আমরা যে খাবার খাই, পাকস্থলীতে তা পুরোপুরি হজম হতে এবং এর পুষ্টিগুন শোষণ করতে "শরীর" অন্তত আট ঘন্টা সময় নেয় ।
সভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে~
যখন খাদ্য পুরোপুরি হজম হয়ে যায় এবং শরীর সেখান থেকে পুষ্টিগুণ শোষণ করে ফেলে; তারপর কি ঘটে ?
হজম হওয়া খাদ্যে, শরীরের সংগ্রহ করার মতো আর যখন কোন পুষ্টিগুণ অবশিষ্ট থাকে না, তখন আমাদের শরীর যকৃৎ এবং মাংসপেশীতে সঞ্চিত থাকা গ্লুকোজ বা ফ্যাট থেকে পুষ্টি/শক্তি নেয়ার চেষ্টা করে।
ঠিক এই মুহূর্ত হতে চর্বি খরচ হওয়ার কারণে আমাদের শরীর তার ওজন হারাতে শুরু করে` অর্থাৎ আমাদের ওজন হ্রাস পেতে শুরু করে, এরফলে কোলস্টেরল এর মাত্রা কমে যায়, এমন কি রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা কমে যায় অর্থাৎ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমে যায় ।
রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে সেহেরী খাওয়ার ৮ ঘণ্টা পর হতে কিছুটা দুর্বল এবং ঝিমুনির ভাব আসতে পারে ।
এভাবে ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে আমাদের শরীর রোজায় অভ্যস্ত হয়ে পরে এবং আমাদের শরীর রোজার সাথে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
ক্যামব্রিজের 'এডেনব্রুকস হাসপাতালে'র কনসালট্যান্ট "ড. রাজিন মাহরুফ" বলেন~
সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে (রোজা না থাকার দিনগুলোতে) আমরা অনেক বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খাই, ফলশ্রুতিতে আমাদের শরীর খাবারের হজম প্রক্রিয়া এবং পুষ্টিগুণ আলাদা করতে এত ব্যতিব্যস্ত থাকে যে~ অন্য অনেক কাজ ঠিকমত করতে পারে না। যেমন: শরীর নিজেই নিজেকে সারিয়ে তোলার কাজ করতে পারেনা বা ইমিউন পাওয়ারকে কাজে লাগাতে পারেনা ঠিকমত।
একারণে বেশি খাবার গ্রহণের ফলে শরীর দ্রুতই অসুস্থ হয়ে পরে~
পক্ষান্তরে রোজার সময় যেহেতু আমরা উপোস থাকছি, তাই শরীর তখন অন্যান্য কাজের দিকে মনোযোগ দিতে পারে, বিশেষ করে শরীর নিজেকে সরিয়ে তোলার দিকে মনোনিবেশ করতে পারে।
এসময় শরীর ভিতরে ও বাহিরের ক্ষত মেরামত, এমন কি সংক্রামক রোগ হতেও শরীর নিজেকে প্রতিরোধ করতে মনোনিবেশ করে।
কাজেই বলা যায়, রোজা বা উপস করোনা সংক্রমণ রোধে কিছুটা হলেও কার্যকরী।
এক কথায় বলাযায়, রোজা শরীরের জন্য বেশ উপকারী।
১৫ রোজার পর থেকে আমাদের শরীরের পাচকতন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি এবং দেহ-ত্বক এক ধরণের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়~
* সেখানে থেকে সব দূষিত বস্তু বেরিয়ে আমাদের শরীর যেন শুদ্ধ হয়ে ওঠে~
* এসময় আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের পূর্ণ কর্মক্ষমতা ফিরে পায়~
* আমাদের স্মৃতি এবং মনোযোগের উন্নতি হয় এবং আমরা যেন শরীরে অনেক শক্তি পাই"~
~ বলছেন ক্যামব্রিজের 'এডেনব্রুকস হাসপাতালে'র কনসালট্যান্ট "ড. রাজিন মাহরুফ"।
একেতো গরমের দিন, তার-উপর সারাদিন না খেয়ে থাকার কারণে ইফতারে দরকার ভারসাম্যপূর্ণ খাবার, যেখানে সব ধরণের পুষ্টি, প্রোটিন বা আমিষ, লবণ এবং পানি থাকবে।
এসময় প্রচুর পানি পান করা প্রয়োজন, নইলে আমরা মারাত্মক পানি-শূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারি। বিশেষ করে গরমের দিনে যদি শরীরে ঘাম হয়।
আর যে খাবার আমরা খাবো, সেটাতেও যথেষ্ট শক্তিদায়ক খাবার হতে হবে। যেমন কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং চর্বি জাতীয় খাবার হতে হবে।
ড. মাহরুফ বলেন,
"রোজা রাখা শরীরের জন্য ভালো, বছরে একমাসের রোজা রাখা হয়তো ভালো। কিন্তু একটানা রোজা রেখে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া যাবে না"।
"একটানা বছর জুড়ে রোজা রাখলে একটা সময় আমাদের শরীর চর্বি গলিয়ে তা শক্তিতে পরিণত করার কাজ বন্ধ করে দেবে। তখন এটি শক্তির জন্য নির্ভর করবে মাংসপেশীর ওপর। এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কারণ আপনার শরীর তখন ক্ষুধায় ভুগবে।"
ড. মাহরুফের পরামর্শ হচ্ছে, রমজান মাসের পর মাঝে মধ্যে অন্যধরণের রোজা করা যেতে পারে। যেমন ৫:২ ডায়েট (পাঁচদিন কম খেয়ে দুদিন ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করা)। যেখানে কয়েকদিন রোজা রেখে আবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাওয়া-দাওয়া করা যেতে পারে।
~আজিজ মিসির সেলিম~
Comments
Post a Comment