#জনস্বার্থে_পান্তা_প্যাচালি:
বৃষ্টিবিহীন এই গ্রীষ্মের তাপদাহে সেহেরী বা ইফতারী হিসেবে পান্তা-ভাত রোজাদারদের জন্য কতটুকু উপকারী ?
লুঙ্গি-গেঞ্জি, মাছ-ভাত, ভাটিয়ালি-মুর্শিদী, রিক্সা-সাইকেলের মত পান্তা-ভাতও বাঙ্গালী সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, শুধুমাত্র মানসিকতার কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারী ও সহজলভ্য এই খাবার-টি ।
আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে একসময় গরীবের খাবার হিসেবে পরিগণিত হওয়া "রুটি" ও "পান্তা-ভাতে'র মধ্যে "রুটি" বর্তমানে ভদ্রসমাজে নিত্য আহার্য হিসেবে গৃহীত হলেও ; পরিত্যাক্ত হয়েছে পান্তা ভাত ।
এখন বাংলাদেশের বাঙ্গলিসমাজ পহেলা বৈশাখে একদিনের জন্য বাঙালিয়ানা প্রদর্শনের নিমিত্তে পান্তা-ভাত আহার করলেও; এই উপকারী খাদ্যটিকে নিত্য আহার্যে পরিণত করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যা, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কেরালা ।
এছাড়াও বর্তমানে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন এবং ইন্দোনেশিয়াতেও এই পান্তাভাত খাওয়া হচ্ছে দেদারছে~
বলাই-বাহুল্য, স্থানভেদে এই উপকারী খাদ্যটি'র নাম এবং প্রস্তুত প্রণালীতে কিছুটা ভিন্নতা আছে~
প্রশ্ন হচ্ছে~ সময়ের পরিক্রমায় ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতির কারণে গরীবের খাবার বলে পরিচিত এই খাদ্যটিকে আমরা পরিত্যাগ করলেও; জ্ঞানে বিজ্ঞানে ও অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত অনেক জনগোষ্ঠী কেন এই খাদ্যটিকে তাদের নিত্য-আহার্য হিসেবে গ্রহণ করছে ??
এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকায়িত আছে ~ গ্রীষ্মের তাপদাহে'র দিনগুলিতে সেহেরী ও ইফতারী হিসেবে পান্তাভাত রোজাদারদের জন্য কতটুকু উপকারী~
এই পান্তা ভাতের ওপরেই গবেষণা করেছেন ভারতের "আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়" এর বিজ্ঞানীদের একটি দল, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন "কৃষি জৈব প্রযুক্তি বিভাগে'র অধ্যাপক "ড. মধুমিতা বড়ুয়া"।
এই গবেষণার ফলাফল পরবর্তীতে "এশিয়ান জার্নাল অব কেমিস্ট্রি'তে প্রকাশিত হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সহ বিশ্বের যেসব অঞ্চলে প্রচুর ধান উৎপন্ন হয় এবং যেসব দেশে ভাত প্রধান খাবার, মূলত সেসব দেশে ভাত পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার সংস্কৃতি চালু আছে অর্থাৎ পান্তাভাত খাওয়ার প্রচলন আছে।
গবেষণায় দেখা গেছে পান্তা ভাতে নানা ধরনের "মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট" বা পুষ্টিকর খনিজ পদার্থ রয়েছে। যেমন: আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক, ফসফরাস, ভিটামিন বি ইত্যাদি।
মধুমিতা বড়ুয়া বলেন~ তারা দেখেছেন সাধারণ ভাতের তুলনায় পান্তা-ভাতে এসব পুষ্টিদায়ক পদার্থের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে আয়রনের পরিমাণ থাকে ৩.৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে তৈরি পান্তা ভাতে এর পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হয় ৭৩.৯ মিলিগ্রাম।
একইভাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণও অনেক বেড়ে যায়। ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে যেখানে ক্যালসিয়াম থাকে ২১ মিলিগ্রাম, সেখানে পান্তা ভাতে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৫০ মিলিগ্রাম।
গবেষণায় দেখা গেছে, একইভাবে অন্যান্য খাদ্য উপাদানগুলিও পান্তা-ভাতে অনেক বৃদ্ধি পায়~
মনে প্রশ্ন জগতেই পারে, যে পন্তায় পুষ্টিদায়ক পদার্থ বৃদ্ধিপায় কিভাবে ?
দীর্ঘ ১০/১২ ঘণ্টা পানিতে ভাত ভিজিয়ে রাখার কারণে পানি ও ভাতের মধ্যে একধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এসময় পানির নিচের ভাত বাতাস বা অক্সিজেন এর সংস্পর্শ পায় না। একারণে পত্রের ভিতর এনারবিক ফার্মেনটেশন এর ঘটনা ঘটে।
"ভাতের মধ্যে ফাইটেটের মতো যে এন্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর আছে সেটা আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিংকের মতো পুষ্টিকর পদার্থকে বেঁধে রাখে।
ফলে ভাত খাওয়ার পরেও মানুষের শরীর এসব গ্রহণ করতে পারে না।
কিন্তু ফারমেন্টেশনের (পানির সাথে ভাতের বিক্রিয়া) কারণে পান্তা ভাতের ফাইটেট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তখন পুষ্টিকর পদার্থগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়লে আমাদের শরীর সেগুলো গ্রহণ করতে পারে," বলেন মধুমিতা বড়ুয়া।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পান্তা ভাতে থাকা পুষ্টিকর পদার্থগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটিকে শক্তিশালী করে।
"মধুমিতা বড়ুয়া" বলেন, দেহের রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে আয়রন, যেটা পান্তা ভাতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়।
শরীরে হাড়গুলোকে শক্ত রাখে ক্যালসিয়াম। শরীরে নিঃসৃত এনজাইমকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে ম্যাগনেসিয়াম।
"মধুমিতা বড়ুয়া" বলেন, এছাড়াও তারা গবেষণায় দেখেছেন যে পান্তা ভাতে প্রচুর পরিমাণে এমন উপাদান আছে, যা শরীরকে প্রদাহ বা যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করে এবং শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে।
তাছাড়া পান্তাভাত কোলেস্টোরেল কমাতেও সাহায্য করে।
এছাড়াও পান্তা ভাতে রয়েছে~ "আইসোরহ্যামনেটিন-সেভেন-গ্লুকোসাইড-ফ্ল্যাভোনয়েড এর মত মেটাবলাইটস" যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।"
তিনি জানান, গবেষণায় তারা দেখেছেন যে পান্তা ভাতে ল্যাকটিক এসিড এবং এমন ব্যাকটেরিয়া রয়েছে যা সাধারণত দই-এর মধ্যে পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।
"আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়" এর গবেষণায় পান্তা ভাতের কোনো খারাপ দিক পাওয়া যায় নি।
তবে ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য এই খাবার ক্ষতিকর কীনা সেটা জানতে তারা এখনও কাজ করে চলেছেন।
তবে "মধুমিতা বড়ুয়া" বলেছেন, ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভাতের ফারমেন্টেশন হলে সেখানে অ্যালকোহলের উপাদান তৈরি হতে পারে এবং সেই পান্তা ভাত খাওয়ার পর শরীর ম্যাজ ম্যাজ ম্যাজ করতে পারে ও ঘুম পেতে পারে।
এছাড়াও পান্তা ভাত যদি পরিষ্কার পাত্রে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে তৈরি করা না হয়, তাহলে সেখানে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, সেই ভাত খেলে মানুষ অসুস্থ হতে পারে।
এখন আপনারাই বলুন; বৃষ্টিবিহীন এই গ্রীষ্মের তাপদাহে সেহেরী ও ইফতারী হিসেবে পান্তা-ভাত রোজাদারদের জন্য কতটুকু উপকারী ?
Comments
Post a Comment