Skip to main content

গল্পঃ হলেও সত্যি~

 গল্পঃ হলেও সত্যি; 

এক অনবদ্য ইতিহাস। নবাব সিরাজউদ্দৌলা এর সময় পান্তা-ভাত ও কুচো-চিংড়ি'র বদৌলতে একজন ছোট মুদি দোকানদার প্রথমে জমিদার এবং পরে রাজা হয়েছিলেন।


১৭৫৬ সালের কথা। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব তখন সিরাজ-উদ-দৌলা। 

ইতিহাসবিদ "আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া" কর্তৃক লিখিত নবাব সিরাজউদ্দৌলা এর জীবন কাহিনী মূলক বই থেকে পাওয়া যায় যে, বাণিজ্য করতে আসা ইংরেজ বণিকরা সে সময় চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে কলকাতা এবং কাশিমবাজার কুঠিতে দুর্গ নির্মাণ করেছিল, ব্যবসার আড়ালে সামরিক সরঞ্জাম বৃদ্ধি করছিল। ফলশ্রুতিতে সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করেছিলেন। 

তবে কলকাতা আক্রমণের আগে ১৭৫৬ সালের ২৪শে মে তিনি ৩,০০০ অশ্বারোহী সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি (ফ্যাক্টরি) দখল করার জন্য।

সে সময় কাশিমবাজার কুঠিতে ছিল বেশ কয়েকজন ইংরেজ অফিসারসহ ৩৫ জন শ্বেতাঙ্গ সৈন্য, ৩৫ জন তেলেঙ্গা সৈন্য এবং ইংরেজ কর্মচারীদের পরিবার।

         শেষপর্যন্ত কাশিমবাজার কুঠির প্রধান "ওয়াটস" নবাবের কাছে মুচলেকা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।

ইংরেজ কর্মকর্তাদের সপরিবারে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় মুর্শিদাবাদ কারাগারে। মহিলাদের স্থান হয় নবাবের জেনানা মহলে।

এই আটক ইংরেজদের একজন হলেন "ওয়ারেন হেস্টিংস" যিনি পরবর্তীকালে বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন।


সেসময় "ওয়ারেন হেস্টিংস" কাশিমবাজার কুটির নম্নপদস্থ সামান্য একজন কর্মচারী হওয়ার সুবাদে কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান সিরাজে'র বন্দিশিবির থেকে । 

অতঃপর তিনি সোজা চলে যান কাশিমবাজারে।


ওদিকে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিশাল সামরিক বাহিনী কলকাতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শুনে "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি'র সবাই কলকাতা থেকে পালিয়ে চলে যায় "ফলতায়"।

ওয়ারেন হেস্টিংস কাশিমবাজারে থেকে নবাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে গোপনে তা পাঠাতে থাকেন "ফলতায়" অবস্থিত ইংরেজ কর্তাব্যক্তিদের কাছে।


কিন্তু তার গুপ্তচরবৃত্তির খবর ফাঁস হয়ে যায় এবং নবাব সিদ্ধান্ত নেন "ওয়ারেন হেস্টিংস'কে আবার গ্রেফতার করার।

এই খবর জানতে পেরে "হেস্টিংস" কাশিমবাজার ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু নবাবের রাজ্যে, পালাবেন কোথায়? যাবেনই বা কতদূর?


উপায় আন্তর না দেখে তিনি হাজির হলেন তার বাঙালী বন্ধু "কৃষ্ণকান্ত নন্দী"র কাছে। 

এখন মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে , "ওয়ারেন হস্টিংস এবং কৃষ্ণকান্ত নন্দী" বন্ধু হলেন কিভাবে? একজন ইংরেজ আর আরেকজন বাঙ্গালী !!!


এই কৃষ্ণকান্ত নন্দী ছিলেন একজন মুদি ব্যবসায়ী। কাশিমবাজার শহরে তার একটি ছোট মুদি দোকান ছিল। দোকানদারি'র সূত্রে ইংরেজদের সাথে তার পরিচয়, সেই সুবাদেই ইংরেজ কোম্পানিতে দলিল লেখক বা মুহুরী পদে চাকরিতে ঢোকেন "কৃষ্ণকান্ত নন্দী"।

প্রায় একই সময়ে নিম্নপদস্থ পদে চাকরি নিয়ে কাশিমবাজারে এসে হাজির হন "ওয়ারেন হেস্টিংস"। দুইজনই সমবয়স্ক এবং নিম্নপদস্থ কর্মচারী হওয়ায় একে অপরের কাছাকাছি চলে আসেন দ্রুতই এবং বন্ধুতে পরিণত হন।


সেই বন্ধুত্বের সুবাদেই "ওয়ারেন হোস্টিংস" আশ্রয় নেন "কৃষ্ণকান্ত নন্দী'র দোকানে।

কৃষ্ণকান্ত "হেস্টিংস'কে প্রথম ক'দিন লুকিয়ে রেখেছিলেন তাদের ঐ মুদি দোকানে। 

দোকানে কোন উপযুক্ত খাবার না থাকায় "কৃষ্ণকান্ত নন্দী" "ওয়ারেন হেস্টিংস"কে এসময়_গুলিতে খেতে দিতেন "পান্তা-ভাত আর কুচো চিংড়ি"।

এরপর নবাবের গুপ্তচরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেখান থেকে তাকে সরিয়ে নিয়ে তোলেন নিজের বাড়িতে।


"লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স"-এর অধ্যাপক "তীর্থংকর রায়" "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস" শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। 

এতে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে "রেগুলেটিং অ্যাক্ট"-এর অধীনে ভারতে "ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি"র বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন "গভর্নর-জেনারেল" নিয়োগ করা হয়।

নিয়তির পটপরিবর্তনের কারণে সেই গভর্নর-জেনারেল হয়েছিলেন একসময়ের কোম্পানির নিম্নপদস্থ কর্মচারী "ওয়ারেন হস্টিংস" ।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, "ওয়ারেন হস্টিংস" ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়েও তার দুর্দিনের খাদ্য পান্তা-ভাতে'র মাহাত্ম্য যেমন ভোলেননি, তেমনই ভোলেন নি দুর্দিনের পরম বন্ধু এবং পান্তাভাতের যোগানদাতা কৃষ্ণকান্ত নন্দীকে। পান্তাভাত তার এতই পছন্দের ছিল যে, তিনি গভর্নর জেনারেল বা বড়লাট হয়েও "পান্তা-ভাত আর কুচো চিংড়ি" খেতেন নিয়মিত।


বড় লাট হওয়ার পর "ওয়ারেন হস্টিংস" কৃষ্ণকান্তকে তার বেনিয়া বা কমার্শিয়াল এজেন্ট নিয়োগ করেন। 

           উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, 'ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি'র হয়ে কাজ করে এবং রেশমের ব্যবসা করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হন "কৃষ্ণকান্ত নন্দী"।

             বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যায়, হেস্টিংসে'র পত্তনী ব্যবস্থার অধীনে ১৭৭২ সাল থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত "কৃষ্ণকান্ত নন্দী" বাহারবন্দ পরগণার (বর্তমান গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা) জমিদারি করেছেন অর্থাৎ জমিদার ছিলেন।

শুধু তাই নয়, চিরস্থায়ী প্রথার সুযোগ দানের মাধ্যমে "ওয়ারেন হেস্টিংস" "কৃষ্ণকান্ত নন্দী'কে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় বহু জমিদারি কিনতে সহায়তা করেন।

এমনকি নাটোরের রানি ভবানীর সম্পত্তির একাংশ দখল করে হেস্টিংস সেটি বন্ধু কৃষ্ণকান্তের হাতে তুলে দেন।


কৃষ্ণকান্ত নন্দী এতটাই ধনশালী হয়েছিলেন যে তার জমিদারি অঞ্চলকে ইংরেজরা "কাশিমবাজারের-রাজ" খেতাব দিয়েছিলেন।

"ওয়ারেন হেস্টিংস" যখন বাংলা ছেড়ে চলে যান, তখন তার সুপারিশ অনুযায়ী কাশিমবাজারের গভর্নর "স্যার ফ্রান্সিস সাইকস্"ও কৃষ্ণকান্তকে তার কমার্শিয়াল এজেন্ট বা বানিয়া নিয়োগ করেন।


এভাবেই "পান্তাভাত আর কুচো চিংড়ি"র দক্ষিনাতে একজন মুদি দোকানি প্রথমে জমিদার এবং পরে রাজা বনে গিয়েছিলেন~


১৭৯৪ সালে কৃষ্ণকান্ত মৃত্যুবরণ করেন। কান্ত বাবুর পুত্র "লোকনাথ নন্দী" বাংলার অন্যান্য অংশে তাঁর জমিদারির বিস্তৃতি ঘটান। তিনি মুর্শিদাবাদের নবাবের নিকট থেকে ‘মহারাজা’ উপাধি লাভ করেন। "লোকনাথ নন্দী" ১৮০৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। উনাদের বংশধর "শ্রীশ চন্দ্র নন্দী" যিনি জমিদারি করেছেন ১৮৯৭সাল থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। 

১৯৩৭ সালে জমিদারদের কোটায় তিনি বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী "শের-এ-বাংলা এ.কে ফজলুল হকে'র মন্ত্রিসভার (১৯৩৭-৪২) একজন মন্ত্রী ছিলেন।


এই হলো পান্তাভাত এর মহত্ব।

Comments

Popular posts from this blog

সময়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের ধরন-ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও প্রয়োগিক পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না ?

 সময়ের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন হতে পারে বলে আমার অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা মনে করে থাকেন, এবিষয়ে আমার জানা ইসলামের আলোকে একান্ত বেক্তিগত মতামত~           আপনি বা আপনারা যদি ইসলামকে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম বলে বিশ্বাস করে থাকেন ; তাহলে আপনাদের এই ধারণা আল্লাহকে বা সৃষ্টিকর্তাকে ছোট বা খাটো করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ এমন একটি সত্তা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত বা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটবে, বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে যেসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে, সে-সব কিছুই তিনি অবগত ছিলেন এবং আছেন। কাজেই সময়ের সাথে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যদি ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ মনে করতেন, তাহলে উনি উনার বার্তাবাহক অর্থাৎ রাসূল মুহম্মদ সা: মারফত তা জানিয়ে দিতেন। উনি ভবিষ্যতের যেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন, মুহম্মদ সা: এর মাধ্যমে তা জানিয়ে দি...

মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?

 মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?  ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।  ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়) অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)  অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~ এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ? কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি। তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে। কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~ গালির সংজ্ঞা কী? "গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নি...

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...