দৃষ্টি আকর্ষণ:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘র্যাগ ডে’ পালনের নামে অশ্লীলতা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেন হাইকোর্ট !!
র্যাগ ডে’ পালনের নামে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজে পার্টিসহ নগ্ন, অশ্লীল, উন্মত্ত, কুরুচিপূর্ণ ও আপত্তিকর কর্মকাণ্ড বন্ধে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
শিক্ষাসচিব, তথ্যসচিব, সংস্কৃতিসচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানসহ বিবাদীদের প্রতি এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
* প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে কেন হাইকোর্টকে রুল জারি করতে হলো?
একটা সময় ছিল, যখন স্কুল/কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় এর শেষ দিনটিকে "বিদায় অনুষ্ঠান" বা "ফেয়ার ওয়েল" এর মাধ্যমে উৎযাপন করা হতো~
দিনটির মূল আকর্ষণ ছিল হলরুম বা খোলা-প্রান্তরে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীদের যৌথ উদ্যোগে আলোচনা সভা, যেখানে অভিভাবক গণের উপস্থিতিও থাকতো চোখে পড়ার মতো~
মূলতঃ এসব অনুষ্ঠানে শিক্ষক ও অভিভাবকগণ~ উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে বেড়-হয়ে গিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কিভাবে জীবন গড়বে ; সেই দিকনির্দেশনা মূলক বক্তৃতা দিতেন, উপদেশ দিতেন, বাস্তবতার নিরিখে ভবিষ্যত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত গুলি তুলে ধরতেন।
ছাত্রছাত্রীরা তাদের অতীত দিনগুলির স্মৃতিচারণ করতেন, ভুলভ্রান্তির জন্য শিক্ষকদের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হতো, স্মৃতিবিজড়িত ক্যাম্পাস ত্যাগের প্রাক্কালে চোখের পানি ফেলত-না এমন ছাত্রছাত্রী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল সেসময়, বিশেষ করে পরবর্তী সময়ে জীবনের প্রয়োজনে কে কথায় চলে যাবে, একে অপরের সাথে আর দেখা হবে কি হবে না, ইত্যাদি কারণে সকলেরই মন কিছুটা বিষন্নতায় ডুবে থাকতো।
ছাত্রছাত্রীরা চাঁদা তুলে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিজেদের স্মৃতি রক্ষার্থে কিছু না কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস দান করতো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক মন্ডলীর পক্ষ হতে বিদায়ী ছাত্রছাত্রীদের জন্য আপ্যায়নের ব্যবস্থা থাকতো, আরও কত কি ?
এরপর "বিদায় অনুষ্ঠান" বা "ফেয়ার ওয়েলে'র পরিবর্তে আগমন ঘটলো ‘র্যাগ ডে’ সংস্কৃতির~
শুরুতে ‘র্যাগ ডে’ পালনে উপরুল্লিখিত ক্রিয়াকলাপের সাথে দিনশেষে গানবাজনা'র প্রচলন শুরু হয়।
সারাদিনের স্মৃতিচারণ, আদেশ, উপদেশ ও আবেগপূর্ণ বিদায় অনুষ্ঠানের পর একটু আনন্দ উৎযাপন, যেখানে শরিক হতো উক্ত প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন-রত সকল শিক্ষার্থী-সহ শিক্ষকবৃন্দ-ও।
এসময় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদায়ী ব্যাচের সৌজন্যে রক্তদানের মত চ্যারিটি অনুষ্ঠানের আয়োজন-ও করা হতো~
এপর্যন্ত যেন বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্গত নীতিনৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের বিষয়গুলি ঠিকই ছিল~
কিন্তু এরপর; যখন থেকে স্মৃতিচারণ মূলক আলোচনা অনুষ্ঠান এবং বিদায়-পর্ব গৌণ হয়ে নিজেদের মধ্যে রং-মারামারি এবং হৈ-হুল্লোড় ‘র্যাগ ডে’ এর মুখ্য বিষয় হয়ে দাড়াল !?! ঠিক তখন থেকেই যেন বাঙালি সংস্কৃতির নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের অধঃপতন হতে শুরু করল~
বর্তমানে রং-মারা-মারির নামে যা হয় তাকে অশ্লীলতা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না । আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা গান-বাজনার নামে বর্তমানে যা করা হচ্ছে; তাকে ভ্যারাইটি-শো ছাড়া আর কোন বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় না~
ভাবতেও অবাক লাগে যে, এখন ‘র্যাগ ডে’ এর নামে নাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ ভাঙচুর করা হচ্ছে, ক্লাস রুমের ফ্যানের পাখা দুমড়ে মুচড়ে দেয়া হচ্ছে, বিদায়ী শিক্ষার্থীদের পরিহিত টি-শার্টে অশ্লীল বাক্য লিখে প্রদর্শন করা হচ্ছে !!!
যেখানে কিছু দেবার কথা, সেখানে উল্টো ধ্বংস করা হচ্ছে ? কেন আদর্শ ও মূল্যবোধের এই ১৮০° অ্যাঙ্গেলে অধঃপতন ?
এই কথা মিথ্যা নয় যে, আমাদের ছাত্র জীবনে আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গসিপ শুনি-নি ? আমরা নিজেরাও হয়তো রং চং মিশিয়ে সেগুলিকে আড্ডার খোরাকে পরিণত করতাম !!
কিন্তু আজকে ‘র্যাগ ডে’ এর উপলক্ষে হাইকোর্টের রিট সংক্রান্ত খবর দেখতে বসে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির সর্বশেষ ব্যাচের 'র্যাগ ডে’ উদযাপনের যে ভিডিও কাটপিস দেখলাম, তাতে মনেহলো বিগত দিনগুলিতে আমরা জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে যে সমস্ত গসিপ শুনে এসেছি, তা নেহায়েত-ই কম ছিল। (কমেন্টস এ ভিডিও লিংক দেয়া আছে)
কেন জানি না, হটাৎ মনে পড়ে গেল কলেজ জীবনের লুকিয়ে যাত্রা পালা দেখার স্মৃতিগুলো। উক্ত ব্যাচের মেয়েদের নাচ, আর নাচের সাথে ছেলেরা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল; তাতে যাত্রাপালার মাঝখানে "প্রিন্সেস"দের নাচ, আর নাচের সময় থার্ড-ক্লাসে (মাটিতে) বসা দর্শকদের ক্রিয়াকলাপ গুলি চোখে ভেসে উঠছিল।
Cuet এ পড়া অবস্থায় রাঙ্গুনিয়ায় বন্ধুবান্ধব মিলে ভ্যারাইটি-শো দেখতে গিয়েছিলাম, বেশিক্ষণ নয় আধাঘন্টার মত থেকে আমরা বেড়িয়ে এসেছিলাম। সেই স্মৃতিও মনে পরে-গেলো।
অবশ্য জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটির ‘র্যাগ ডে’ এর নৃত্যানুষ্ঠান-কে বাংলাদেশের এসব যাত্রাপালার নাচ বা ভ্যারাইটি-শো'র সাথে তুলনা না করে ইউরোপের __ক্লাব গুলির সাথে তুলনা করাটা অধিকতর শ্রেয়, কারণ তুলনামূলক ভাবে কোয়ালিটি ঐগুলোর চাইতে বেশ উন্নত ।
বলাইবাহুল্য; ওয়েস্টার্ন কালচারে হয়তো এধরনের নাচগান নিন্দনীয় নয় ! আমার জানা নেই যে, ইউরোপ আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিজয় দিবসে এই ধরনের উদ্দাম নাচ-গান প্রদর্শিত হয় কি-না? পাঠকদের মধ্যে কেউ যদি উচ্চ শিক্ষার্থে ঐসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে থাকেন, তিনি হয়তো ভালো বলতে পারবেন~
তবে আমাদের দেশটি যেমন ওয়েস্টার্ন কান্ট্রি নয়, তেমনই আমাদের সংস্কৃতিও পশ্চিমা সংস্কৃতি নয়।
হয়ত: আমাদের মনের গহীনে বাঙালি সংস্কৃতি লুকায়ীত আছে বলেই বিষয়টিকে আমাদের কাছে অশ্লীল মনে হচ্ছে, নীতিনৈতিকতা/আদর্শ ও মূল্যবোধের অধঃপতন মনে হচ্ছে ~
প্রশ্ন হচ্ছে, এই অধঃপতনের দায়ভার কার?
এই যে বিদায়ী ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের "বিদায়-অনুষ্ঠান" বা "ফেয়ারওয়েল" ক্রম-পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রারম্ভিক_ ‘র্যাগ ডে’ থেকে আজকের ‘র্যাগ ডে’ তে আবির্ভূত হলো~ এর দায়ভার কার ?
শুধুই কি ছাত্র ছাত্রীদের ?
অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষা অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের কি কোন দায় নেই?
শিক্ষার্থীদের এমন আচরণকে মূল্যবোধের অবক্ষয় হিসেবেই দেখছেন এদেশের সমাজবিজ্ঞানীরা।
"কে কি মনে করল"~ সেটা এখনকার ছেলেমেয়েরা কিছু মনে করে না। সে কারণে এ উচ্ছৃঙ্খলাতা দেখা যায় বা দেখা যাচ্ছে। এটা কিন্তু তারাই করে, যাদের বেড়ে ওঠা-টা সুন্দর হয়নি এবং যাদের মধ্যে মূল্যবোধের সংকট তৈরি হয়েছে।
একটি সন্তান, সে ছেলে হোক বা মেয়ে হোক; তার সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠা, তার ভিতরে বাঙালি সংস্কৃতির অন্তর্গত নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও মূল্যবোধের বিষয়গুলি ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রথম দায়িত্ব কিন্তু পিতামাতার বা অভিভাবকদের এবং তারপর শিক্ষকদের, আর এই শিক্ষকরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কিনা সেটি দেখার দায়িত্ব শিক্ষা অধিদপ্তর বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর।
আজকে যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘র্যাগ ডে’ এর নামে এইসব উশৃঙ্খতা প্রদর্শন করা হচ্ছে , অনতিবিলম্বে সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হর্তাকর্তা ব্যক্তিবর্গ সহ পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিৎ, সেইসাথে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত ওই সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী'দের অভিভাবকদেরকে~
তবেই হয়তো এই অপসংস্কৃতির প্রদর্শনী তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হতে পারে~
কিন্তু তাতে কি হটাৎ করেই নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের অধঃপতন বন্ধ হয়ে যাবে ? অথবা উন্নতি ঘটবে ? মনে হয় না~
নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধের এই অধঃপতন রোহিত করতে হলে; এই অপসংস্কৃতির মূলোৎপাটন করতে হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে, সেইসাথে অভিভাবকদেরকে তাদের সন্তানদের প্রতি আরও দায়িত্ব-বান হতে উৎসাহিত করতে হবে, দেশব্যাপী এসংক্রান্ত সচেতনতা তৈরির জন্য শিক্ষা অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়কে প্রচার/প্রচারণা জোরদার করতে হবে~
এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণের কোন সুযোগ নেই, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে~<
অন্যথায় এই জেনারেশন কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা হয়তো আমরা কেও-ই কল্পনাও করতে পারছি না~
ধন্যবাদ হাইকোর্টকে; যথাসময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।
Comments
Post a Comment