Skip to main content

কুসংস্কার

 #সংস্কার_বা_কুসংস্কার:

দৈনন্দিন জীবনের কোনো ঘটনাকে ভবিষ্যতের মঙ্গল বা  অমঙ্গলের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করাই হলো কু-সংস্কার। কু-সংস্কার এমন এক বিশ্বাস, যা মানুষ আবহমানকাল ধরে বংশপরম্পরায় মেনে আসছে। 


কুসংস্কার নামক আচরণের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, ভীতি মানুষের সহজাত। যার কোনো সুনির্দিষ্ট উৎস খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু মানুষ মাত্রই তা মেনে থাকে। 

যদিও এসব কুসংস্কার বা সংস্কারের অধিকাংশই হাস্যকর, ভিত্তিহীন এবং শুধুই জনশ্রুতিনির্ভর। কিন্তু অন্তরে লালিত সংস্কার থেকেই তা শ্রদ্ধা, বিশ্বাসের সঙ্গে মেনে থাকে এমন জাতি/ধর্ম/সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। 


প্রথমে আমাদের দেশে চালু থাকা কিছু কুসংস্কার এর উল্লেখ করা যাক, শেষে বিদেশের কিছু কুসংস্কার এবং তার কারণ নিয়ে আলোচনা করা যাবে~

যেমন: 

* বছরের প্রথম দিন ভালোভাবে অতিবাহিত হলে বছরের অন্যান্য দিনও ভালোভাবে যাবে- এই বিশ্বাসে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষের মাঝেই কমবেশি আছে, ফলে বিশ্বজুড়ে এই দিনটিতে ভালো পোশাক, ভালো খাবারের প্রথা বিরাজমান বহুকাল ধরে।

* পোষা বিড়ালকে তার গা বা পা চেটে পরিষ্কার করতে দেখা গেলে বাড়িতে মেহমান আসার ইঙ্গিত বলে ধরা হয়ে থাকে আমাদের দেশে।

* আবার পোষা কুকুর যদি বাড়ির আঙিনায় অস্বাভাবিক শব্দে ডাকে তবে তা বিপদ বা কোনো ক্ষতির আশঙ্কা হিসেবে মনে করা হয় আমাদের দেশে।

* যদি ডান হাতের চেটো চুলকায় তাহলে অর্থ প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা বলে আশা করে থাকে অনেক পুরুষ মানুষ।

* যদি খেতে বসে কেউ বিষম খায় তবে ধরে নেয়া হয় তাকে নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা হচ্ছে বা কেউ তাকে স্মরণ করছে।

*কোনোখানে কারো সম্পর্কে আলোচনা চলা অবস্থায় যদি ঘটনাক্রমে সেখানে উক্ত ব্যক্তি উপস্থিত হয়, তাহলে তিনি বেশিদিন বেচে থাকবেন বলে মনে করে অনেকেই।

* ভাঙা আয়নায় মুখ দেখা  অমঙ্গলের প্রতীক।

*পরনে থাকা অবস্থায় কাপড় রিপু করা বা ছুটে যাওয়া বোতাম লাগানো অমঙ্গলের লক্ষণ বলে মনে করেন অনেকেই।

* হাত থেকে কোনো জিনিস পড়ে গেলে, যার হাত থেকে পড়ে গেল তার বিপদের সম্ভাবনা বলে ধরে নেওয়া হয়।

* রাতের বেলা টাকা ধার দেয়া হলে তা অশুভ পরিণতি বয়ে আনতে পারে বলে ধরা হয়।

* পরীক্ষা দিতে যাবার সময় ডিম খেয়ে গেলে পরীক্ষায় ডিম বা গোল্লা পাওয়া যাবে।

* নতুন বউকে কোলে করে ঘরে তুলতে হয় এবং তা করতে হয় দুলাভাইকে।

* দোকানের প্রথম কাস্টমারকে ফেরত দিতে নেই।

* রাতে নখ, দাড়ি, গোঁফ কাটা অমঙ্গল।

* ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পিছন থেকে ডাকলে যাত্রা শুভ হয় না।

* ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পিছন ফিরে তাকাতে হয় না, তাতে যাত্রা অশুভ হয়।

* রাতের বেলা ঘরের বাহিরে ময়লাপানি ফেলতে হয়না।

এভাবে লিখতে থাকলে আমাদের দেশের কুসংস্কার গুলি দিয়েই কয়েকটি পোস্ট দিতে হবে, কাজেই ক্ষান্ত নেয়া যাক~


এখন অন্য দেশে প্রচলিত কিছু কুসংস্কার সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক~

** পাখি নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার:

কোরিয়ায় কাক দেখলে তা অশুভ/মন্দ কপালের পরিচায়ক বলে মনে করা হয়। 

কাক যুক্তরাজ্যেও অশুভ লক্ষণ ধরা হয়। 

আবার লন্ডন টাওয়ারে অন্তত সবসময় ছয়টি কাক দেখা না গেলে তা রাজতন্ত্রের পতনের লক্ষণ বলেও মনে করা হয়।

* আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডে একটি দোয়েল পাখি দেখা গেলে তা অশুভ কিন্তু দুই বা তার অধিক দেখা গেলে তা মঙ্গলজনক হিসেবে ধরা হয়।

** অন্যান্য;

ফ্রান্সে সকাল বেলায় মাকড়সা দেখা গেলে তা দুঃখের প্রতীক বলে ধরা হয়।

রাশিয়া ও হাঙ্গেরিসহ এমন অনেক দেশ আছে যেখানে খাবার টেবিলের কোনায় /প্রান্তে আসনগ্রহণ করা হলে তা ৭ বছরব্যাপী বিয়ে না হওয়ার মতো অশুভ বলে ধরা হয়। তাহলে জেনে বুঝে এই ঝুঁকি কে নেবে?


তুরস্ক, কোরিয়া এবং ভারতে সূর্যাস্তের পর হাত/পায়ের নখ কাটাকে অশুভ কাজের পর্যায়ে ফেলা হয়। 

জাপানি কুসংস্কারের মতে এটা এমনকি অকাল মৃত্যুও বয়ে আনতে পারে।


জর্জ ওয়াশিংটন-ও একটি কুসংস্কার মেনে চলতেন, তিনি ফুটপাতের চির ধরা অংশের উপর দিয়ে হাঁটতেন না, অন্যকেও নিষেধ করতেন হাঁটতে। তার মতে এটা নাকি দুর্ভাগ্যের কারণ।


** গাণিতিক কুসংস্কার:

বিশ্বব্যাপী বহুল প্রচলিত অশুভ সংখ্যা ধরা হয় ‘১৩’ কে। অনুসন্ধানকারীদের হিসেবে দেখা গেছে শতকরা ১০ জন আমেরিকানের মধ্যে ‘১৩’ সংখ্যাটিকে নিয়ে একটি ভীতি প্রচলিত আছে এবং বছরের ‘১৩’ তারিখ বিশিষ্ট শুক্রবারটি নিয়ে তা আরো বেশি, যা একটি ‘ফোবিয়া’ বলে পরিচিত। ফলশ্রুতিতে ঐ বিশেষ দিনে কাজে যাওয়া, বেড়াতে যাওয়া এমনকি বিয়ে করতে যেতেও আপত্তি আছে অনেকের-  যার কারণে বছরে ৮শ’ মিলিয়ন ডলারেরও অধিক আর্থিক ক্ষতি হয় আমেরিকায়, বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।

আমেরিকার অ্যাসভিলি, নর্থ ক্যারোলিনার অনেক অংশে শতকরা ৮০ ভাগ হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে ‘১৩’ তম তলাটি অনুপস্থিত থাকে অথবা ১৩ তম তলাটি অব্যবহৃত থাকে। এখনকার অধিকাংশ হোটেল, হাসপাতাল ও বিমানবন্দরের কক্ষ ও প্রবেশদ্বারগুলোতে এই সংখ্যাটি এড়িয়ে যাওয়া হয়।


প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় ৪ সংখ্যাটিকে অশুভ হিসেবে ধরা হতো, যা এশিয়ার অনেক অঞ্চলেই এখনও প্রচলিত। জাপানে ৪  উপাদান বিশিষ্ট উপহার প্রদান এড়িয়ে যাওয়া হয়- যেমন ৪  ফুল বা যে কোনো ৪ টি সামগ্রীর সমন্বয়ে সাজানো একটি উপহার প্যাক; এমনকি এপার্টমেন্ট, বিল্ডিং এর ৪ তলা বসবাসের জন্য অশুভ ভাবা হয় জাপানে। 

এছাড়াও ফ্ল্যাট নম্বর বা যেকোনো কিছুতেই সন্তর্পণে ৪  সংখ্যাটি এড়িয়ে চলা হয়।

জাপানে প্রথাগতভাবে সরকারি/বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে ৪ সংখ্যার ব্যবহার রীতিমতো বিরল- ঘটনা।

এছাড়াও চিনে ৪ সংখ্যা টি মৃত্যু শব্দের সমার্থক অর্থাৎ ৪ সংখ্যাটি চীনেও অশুভ বলে পরিচিত।


*** যে কারণে ১৩ সংখ্যাটিকে অশুভ ভাবা হয় ?

২৫০০ খিষ্টপূর্বাবদে ব্যাবিলনীয় রাজা "হাম্বুরাবী" পৃথিবীতে প্রথম মানুষের জন্য আইন শাস্ত্র প্রণয়ন করেন। যার নাম ‘দি কোড অব হাম্বুরাবি’ । এতে ১৩ তম বিধিটি অনুপস্থিত ছিল। আজ থেকে ৪৫২২ বছর পূর্বে

‘দি কোড অব হাম্বুরাবি’ এর লিখন-কালে ক্রমানুসারে লিপিবদ্ধ করার গাণিতিক জ্ঞান তখন পর্যন্ত অনাবিষ্কৃত ছিল বলেই জ্ঞানিগগুনিজন ধারণা করে থাকেন, একারণেই হয়তো ১৩ নম্বর ধারাটি অনুপস্থিত হয়ে থাকতে পারে ~

মূলতঃ একারণেই গণনা শুরুর পর থেকে ১৩ সংখ্যাটি আমেরিকান মানুষের কাছে অশুভ হয়ে গেলো।


আরেকটি ঘটনা, যার কারণেও ১৩ সংখ্যাটি কে অশুভ ভাবা হয়~

যিশু ও তার শিষ্যদের একত্রে শেষ আহার (দি লাস্ট সাপার) অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত ১২ জন শিষ্যের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক ‘জিহুদা ঈস্করিয়’ এর ‘১৩’ তম সদস্য হিসেবে হঠাৎ অনুপ্রবেশ। কথিত আছে যে, উৎকোচের বিনিময়ে "জিহুদা ঈস্করিয়" শত্রুদের (ক্রুশবিদ্ধকারীদেরকে) আত্মগোপনে থাকা যিশুর অবস্থান জানিয়ে দেয়। একারণেও অনেকে ১৩ সংখ্যাটিকে অশুভ ভেবে থাকেন, বিশেষ করে ইউরোপ।


 এরকম হাজারো কুসংস্কার পৃথিবীতে প্রচলিত আছে, যাদের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে মানুষের বিশ্বাসে তা টিকে আছে যুগের পর যুগ~

Comments

Popular posts from this blog

সময়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের ধরন-ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও প্রয়োগিক পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না ?

 সময়ের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন হতে পারে বলে আমার অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা মনে করে থাকেন, এবিষয়ে আমার জানা ইসলামের আলোকে একান্ত বেক্তিগত মতামত~           আপনি বা আপনারা যদি ইসলামকে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম বলে বিশ্বাস করে থাকেন ; তাহলে আপনাদের এই ধারণা আল্লাহকে বা সৃষ্টিকর্তাকে ছোট বা খাটো করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ এমন একটি সত্তা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত বা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটবে, বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে যেসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে, সে-সব কিছুই তিনি অবগত ছিলেন এবং আছেন। কাজেই সময়ের সাথে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যদি ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ মনে করতেন, তাহলে উনি উনার বার্তাবাহক অর্থাৎ রাসূল মুহম্মদ সা: মারফত তা জানিয়ে দিতেন। উনি ভবিষ্যতের যেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন, মুহম্মদ সা: এর মাধ্যমে তা জানিয়ে দি...

মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?

 মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?  ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।  ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়) অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)  অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~ এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ? কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি। তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে। কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~ গালির সংজ্ঞা কী? "গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নি...

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...