#ইবাদত: (কিছু না বলা কথা)~
প্রেক্ষাপট: রমজান মাসের রোজা~
ইবাদাত শব্দটি ক্রিয়াপদ(Verb),; যার অর্থ আনুগত্য করা, দাসত্ব করা, গোলামী করা, বিনয়ী হওয়া, অনুগত হওয়া, মেনে চলা ইত্যাদি । ইসলামী পরিভাষায় মানুষের দৈনন্দিন, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক এবং বাৎসরিক সমস্ত কাজই ইসলামিক পদ্ধতিতে করার নামই এবাদত।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে ~ আমরা অধিকাংশ মানুষ শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত সহ কিছুসংখ্যক আমলকে শুধুমাত্র ইবাদত ভেবে ভুল করি; আসলে এইসব আমল সহ একজন মানুষের পায়খানা-প্রস্রাব, ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, কথাবার্তা, চাকরি, ব্যবসা ও কৃষিকাজসহ সবকিছুই এবাদত এর আওতাভুক্ত, যদি তা ইসলামিক পদ্ধতিতে করা হয়~
আবার হযরত মুহাম্মদ সা: এবং উনার সাহাবায়ে কেরামের দেখানো কর্ম পদ্ধতিই হচ্ছে ইসলামিক পদ্ধতি। অর্থাৎ আমল/অজিফা সহ আমাদের খাওয়া-দাওয়া, পায়খানা-প্রস্রাব হাঁটাচলা সহ দৈনন্দিন কাজ গুলো যদি আমরা মোহাম্মদ সা: এর মত করে করার চেষ্টা করি, তাহলেই তা ইবাদত বলে গণ্য হবে~
তবে ইবাদত বলে গণ্য হওয়া এক জিনিস, আর ইবাদত হিসেবে সৃষ্টিকর্তার কাছে গৃহীত হওয়া আরেক জিনিস~
আমাদের যেকোনো কাজ এবং আমল/অজিফা সৃষ্টিকর্তার কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য কয়েকটি শর্ত প্রযোজ্য~
১. নিয়ত বা উদ্যেশ্য~ আমরা কাজটি কার উদ্দেশ্যে করছি অথবা কি নিয়তে করছি ? এইটা একটা বড় ফ্যাক্টর। যেমন রাস্তার ডান পাশ ধরে হাঁটা চলাফেরা করা সুন্নত, অর্থাৎ ইবাদত। কিন্তু আমরা যদি অভ্যাসবশত অথবা রাষ্ট্রীয় আইনের বশবর্তী হয়ে রাস্তার ডান পাশ ধরে হাটা চলাফেরা করি তাহলে তা এবাদত বলে গণ্য হবে না। আমরা যদি সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের আশায় বা তার নির্দেশ পালনের উদ্দেশ্যে রাস্তার ডান পাশ ধরে হাঁটি, তবেই তা এবাদত বলে গণ্য হবে।
বিষয়টি সমস্ত আমল অজিফা এবং কর্মের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ বিষয়টি রমজান মাসের রোজার জন্যও প্রযোজ্য। রোজা রাখার উদ্দেশ্য যদি মানুষের সামনে নিজের পরহেজগারি জাহির করা হয়, বা লোক দেখানো হয় তাহলে নিঃসন্দেহে এই রোজা ইবাদত হিসেবে গৃহীত হবে না।
* মেসওয়াক করা সুন্নত হলেও; আমরা যারা সারা বছর মেসওয়াক না করে, রোজা রেখে বিকেলে গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মেসওয়াক করি ~ তারা অন্যের কাছে নিজেকে রোজাদার হিসেবে জাহির করতে মেসওয়াক করছি না তো ?
* আমরা যারা হজ্ব করার পর পোস্টার ও ব্যানারে নামের আগে হাজী পদবী লাগাচ্ছি, তারা অন্যের কাছে নিজেকে হাজী হিসেবে জাহির করার জন্য তা করছি না তো ?
* আমরা যারা সর্বসময় আরব দেশীয় জাতীয় পোশাক(জুব্বা) পরিধান করে ঘুরে বেড়াই, তারা অন্যের কাছে নিজেকে পরহেজগার হিসেবে জাহির করার জন্য তা করছি না তো ?
* আমরা যারা যাকাতের টাকা গোপনে বিলি বণ্টন না করে, শাড়ি বা জমা কাপড় কিনে, বস্তা বোঝাই করে গ্রামে গিয়ে হাকডাক করে বা মাইকিং করে তা বিলিবন্টন করি, তারা অন্যের কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য তা করছি না তো ?
* আমরা যারা সভা/সমাবেশে মাইকের মাধ্যমে হুজুরের মুখে নিজের নামে মারহাবা, আর নারায়ে তকবির শোনার জন্য বড়-বড় দান-খয়রাত করি, তারা তা অন্যের কাছে নিজেকে জাহির করার জন্য করছি না তো ?
~~~~~~~~
হাশরের ময়দানে আল্লাহ পাক অনেক বড় বড় রিয়াকারকে (লোক দেখানো ইবাদতকারী) প্রতিদান না দিয়ে বলবেন, তোমরা আমার সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করোনি, বরং তোমরা তো ইবাদত করেছ মানুষ তোমাদেরকে বড় আবেদ বা পরহেজগার বলবে, তার জন্য। আর দুনিয়াতে তা বলা হয়ে গেছে।
আরও সহজ ভাবে বোঝার জন্য বলছি~
আমি যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্যেশ্যে মানুষকে সচেতন করতে এই পোস্ট দিয়ে থাকি, তাহলে এটি একটি বড় ইবাদত। আর যদি মানুষ আমার সুনাম করবে ভেবে এই পোস্ট টি দিয়ে থাকি, তাহলে ~~~ সৃষ্টিকর্তার কাছে নাটক/সিনেমা নিয়ে পোস্ট দেয়া আর এই পোস্ট দেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই~
২. হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা~
জীবনযাপনের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ই জীবিকা নির্বাহের অন্তর্গত। আবার
সৎভাবে চাকরি করা, ব্যবসা করা ও কৃষিকাজ করা হালাল রুজি-রোজগারের অন্তর্গত। অবশ্য ভিক্ষাবৃত্তি ঘৃণিত হলেও হালাল রুজি-রোজগারের অন্তর্ভুক্ত, তবে মানুষকে ইসলাম শিক্ষা দেয়া বা আল্লাহর দিকে ডাকার বিনিময়ে অর্থ উপার্জন কোন ভাবেই হালাল রুজি-রোজগারের অন্তর্ভুক্ত নয় ।
আফসোস! এক শ্রেণীর মানুষ ইসলামকেই অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে~ যারা না চাকরি, না ব্যাবসা, না কৃষি, না ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে~ এরাই আবার ইসলামের ধারক ও বাহক এর আসনে আসীন !!
আমরা অনেকেই বেতনের টাকা আলাদা করে জমাই হজ্ব করার জন্য, ইফতার বা সেহেরীর মালাল কেনার জন্য, কিন্তু গাড়ি/বাড়ি/জমি/জমা ইত্যাদি কিনি দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের দ্বারা~
নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে দেখি না কেন ? এটা কি হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা হলো ? এভাবে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে এই হজ্ব ,এই নামাজ, এই রোজা কি সৃষ্টিকর্তার কাছে ইবাদত হিসেবে গৃহীত হবে ?
দান/ছদগা অনেক বড় ইবাদত, যা অনেকসময় আল্লাহর ক্রধকেও প্রশমিত করে, কিন্তু তা হতে হবে হালাল রুজি-রোজগারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করার পর উৎবৃত্ব অর্থ হতে।
আমরা যারা দুর্নীতিবাজ (চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী অথবা কৃষিজীবী) তারা একটু বেশি বেশি দান/ছদগা করে থাকি, অনেক সময় বেতনের টাকা থেকে দান/ছদগা করি কিন্তু গাড়ি/বাড়ি~~~
এইটুকু বুঝতে কি মাদ্রাসায় পড়ার দরকার আছে ? কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়ে কি এইটুকু বিবেক/বুদ্ধি আমাদের জাগ্রত হতে পারে না ?
~~~~~~~~~
নবীজী সা: সাহাবীদের বুঝানোর জন্য বলেন যে~
দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত, এলোমেলো কেশি এক লোক আকাশ পানে হাত তুলে দোয়া করে হে প্রভু! হে প্রতিপালক~~~ অথচ তার পানাহার হারাম, তার পোশাক হারাম, তার জীবিকাও হারাম। এমতাবস্থায় কিভাবে তার দোয়া কবুল হবে। (জামে আত তিরমিজি : ২৯৮৯)
শুধুমাত্র নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাতের জন্য নয়; যে কোন ভালো কাজ বা দোয়া আল্লাহর নিকট গৃহীত হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত হলো ইসলামের দেখানো পথে জীবনযাপন করা বা জীবিকা নির্বাহ করা।
৩. সুন্নত পদ্ধতিতে ইবাদত করা। ইবাদত বা আমল কবুল হওয়ার জন্য প্রিয়নবী সা:-এর অনুসরণ ও অনুকরণ অত্যাবশ্যকীয়। কোনো মনগড়া পদ্ধতিতে ইবাদত করলে তা কবুল হবে না। নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত সহ দৈনন্দিন সমস্ত কাজ যেমন খাওয়া-দাওয়া ঘুমানো, পায়খানা প্রসাব, রুজি-রোজগার ইত্যাদি সবকিছুই মুহম্মদ সা: এর দেখানো পথে হলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে এবং গৃহীত হবে; অন্যথায় নয়।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, রাসূল সা: তোমাদের জন্য যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করো, আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকো। (সূরা হাশর :৭)
হাদিস শরিফে নবীজী সাঃ, ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার মধ্যে আমাদের নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত বলে গণ্য হবে। (সহিহ মুসলিম ),
অন্যকে আল্লাহর পথে ডাকা, দাওয়াত দেয়া, ইসলাম শিক্ষা দেয়া ইত্যাদি অনেক বড়মাপের ইবাদত, কিন্তু তা হতে হবে অবশ্যই মুহম্মদ সা: এর দেখানো পথে বা শেখানো পদ্ধতিতে~
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে; বর্তমান যুগে যেসব পদ্ধতিতে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকা হয়, দাওয়াত দেয়া হয়, এমন কি যেসব পদ্ধতিতে ইসলাম শিক্ষা দেয়া হয়~ তার অধিকাংশের সাথেই মুহম্মদ সা: এর দেখানো বা শেখানো পদ্ধতির কোন মিল নেই।
উপরোক্ত সমস্ত নিয়ম-কানুন-ই মানুষের জন্য। আল্লাহর জন্য নয়। আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা সব নিয়ম কানুন এর উর্ধ্বে~
কাজেই বিগত দিনের রুজি রোজগারের জন্য অনুতপ্ত হয়ে, মনের সহ নিয়তের মাধ্যমে (একমাত্র তার উদ্যেশ্যে) এবং মুহম্মদ সা: এর দেখানো পথে ( সুন্নত তরিকায়) যদি আমরা ইবাদত বন্দেগী করি এবং তার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি; তাহলে তিনি চাইলে তা কবুল (গ্রহণ) করতে পারেন, এমন কি আমাদের ক্ষমাও করতে পারেন।
আর ক্ষমা এমন একটি জিনিস: যার পরে আর কোন ভয়, ভীতি, বা শাস্তির বিষয় থাকে না~
আল্লাহ আমাদের কবুল করুন~ আমিন।
Comments
Post a Comment