Skip to main content

নির্মমতা_যুগে_যুগে

:খোজাঃ পুরুষদের অসহায় হাহাকারের ইতিহাস।

"খোজা" হল জননাঙ্গ অপসারণকৃত নপুংসক পুরুষ। এদের শুধু শুক্রাশয় অথবা শুক্রাশয় এবং শিশ্ন/লিংগ উভয় অংশই কর্তন করে অপসারণ করা হয়। ইংরেজিতে যাদের বলে “ইউনাখ”।


প্রাচীন মিশরীয় সাহিত্যেও খোজাদের নিয়ে বিভিন্ন কাহিনী রচিত হয়েছে, অর্থাৎ মানুষকে খোঁজা করণের ইতিহাস বহু পুরনো।

খ্রিস্টপূর্ব ৮১১ থেকে ৮০৮ অব্দের মেসোপটেমিয়ায়  রাণীমাতা "সামুরামাত" নিজ হাতে তার এক ক্রীতদাসকে খোজা করেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।

প্রাচীন চীনের অভিজাত সমাজেও খজাদের বিশেষ বিশেষ ভূমিকা ছিল। চীনে শিশ্নচ্ছেদ বা লিংগচ্ছেদ ছিল একাধারে শাস্তি এবং খোঁজা করার অন্যতম পদ্ধতি। ষোড়শ সপ্তদশ শতকে চীনে সম্রাট কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত খোযাদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০,০০০!!


খ্রিষ্টান ধর্মীয় খোজা:

একসময় খ্রিস্টানদের মধ্যে স্বর্গ কামনায় খোজাত্ব বরণ করার প্রথা ছিল। পাদ্রী বা নান গণ যেকারনে নারী বা পুরুষ সঙ্গ এড়িয়ে চলে, ঠিক সেই কারণেই খৃষ্টান পুরুষরা নারী সঙ্গ থেকে দূরে থাকতে একসময় সেচ্ছায় খোজাত্ব বরণ করতো।

খ্রিষ্টান ধর্মে প্রার্থনা সংগীত গাওয়ার জন্য খোজদের কদর ছিল। ইউরোপে একসময় অনেক বড় বড় শিল্পী সেচ্চায় পুরুষত্বহীনতা বরণ করে নিত অর্থাৎ অপারেশন করে খোঁজা হয়ে যেত।


তুর্কী খোজা:

খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি বাইজান্টাইন শাষকদের দেখা দেখি তুর্কিরা খুজে পেল খোজা নামক এক নতুন প্রানী (!)। ইতিহাসে তাদের তখন প্রচন্ড গৌরবের কাল, চারিদিক দিয়ে তাদের বিজয় নিশান উড়ছে, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, গ্রিস, এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, মিশর থেকে তখন আসছে ঝাকে ঝাকে বন্দী। মহান সুলতান প্রথম মাহমুদ, এবং দ্বিতীয় মুরাদ এদের মাঝ থেকে কিছু খোজা নিযুক্ত করলেন প্রাসাদের বিভিন্ন অংশের প্রহরী হিসাবে। এরা শেতাঙ্গ খোজা। তুরস্কে তাদের নাম ছিল “কাপু আগাসি”। এদের প্রধানকে বলা হত “কাপি আগা”। ইনি ছিলেন প্রাসাদের রক্ষী বাহিনীর শীর্ষে। প্রচন্ড ক্ষমতার অধিকারী ছিল এই কাপি আগা কোন কোন ক্ষেত্রে সুলতানের উজিরের থেকেও বেশী। দ্বিতীয় প্রধান শেতাঙ্গ খোজাকে বলা হত “হাজিনেদার বাসি” যার অধীনে থাকত রাজকোষ, তৃতীয় প্রধানকে বলা হত “কিলারজী বাসি” যার কাজ ছিল সম্রাটের রান্নাঘরের খাদ্য নিয়ন্ত্রন করা থেকে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এভাবে এক সময় অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ন পদে নিয়োগ পায় খোজারা।

শ্বেতাঙ্গ খোজাদের এই একচেটিয়া অধিকারে এক সময় ভাটা পড়ে যখন দেখা যায় এদের থেকে কৃষ্ণাঙ্গ খোজারা অধিক সবলএবং বিশ্বস্ত।


মোগল হেরেমে খোজা:

১২৯০ সালের দিকে বিশ্ব বিখ্যাত পর্যটক মার্কোপোলো তৎকালীন বাংলা প্রদেশ সফর করেন। তার ভ্রমন কাহিনী থেকে জানা যায় বাংলা মোগল অধিকৃত হওয়ার আগেই এখানে খোজা ব্যবসায়ের রমরমা বাজার গড়ে ওঠে। প্রথম দিকে খোজাদের পুরোটাই আসতো যুদ্ধবন্দিদের শিবির থেকে। 

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুদ্ধ শিবির থেকে মানুষের আমদানিও বন্ধ হয়ে যায়। আগে শুধু সুলতানরাই খোজা রাখলেও এ আমলে উজিরদের সাথে সাথে তৈরি হয় নতুন নতুন আমির ও ওমরাহ্‌। তারাও অনেকটা আভিজাত্যের প্রমাণ দিতে খোজা কেনা শুরু করে। এর ফলে বাংলায় খোজা বাণিজ্যের জনপ্রিয় বাজার গড়ে ওঠে। কলকাতার খোজা বাজারে আফ্রিকান হাবশি এবং দেশীয় খোজা বেচাকেনা হতো।


দেশি এই খোজাদের প্রধান সরবরাহক ছিল সিলেট এবং ঘোড়াঘাট। প্রাচীন তথ্য উপাত্তে সিলেটের নামটিই বিশেষভাবে এসেছে। খোজা সরবরাহের একচেটিয়া বাণিজ্য করত সিলেট ও ঘোড়াঘাটের সরকারেরা। প্রাচীন কাল থেকেই সিলেট একটি বাণিজ্য বন্দর হিসেবে সুপরিচিত ছিল।


১৮৩৬ সালে সালে মুর্শিদাবাদে প্রাসাদে অনুসন্ধানে দেখা যায় সেখানে খোজা আছে ৬৩ জন, নাসিরুদ্দীনের আমলে (১৮৩৬-৩৭) লক্ষ্মৌর বেগম মহলে খোজা ছিল ১৫১ জন। 

খোঁজা করণের পদ্ধতি ও ইতিহাস জানলে গা শিউরে উঠবে। ১৯৫৬ সালে মরক্কোর হাসপাতালে সুলতানের হেরেমের জন্য খোঁজা তৈরি করতে সরকারী হাসপাতালে  ৩০ টি শিশুকে অস্ত্রপচার করা হয়েছিল, যাদের  কেউ বাঁচে নি ।

আবার ইরাকের এক চিকিৎসক জানিয়েছেন, সৌদী আরবের হাসপাতালে কুড়িটি শিশুকে খোজা করার জন্য অপারেশান করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র দুই জন। সেকালে পশ্চিম এশিয়া বা আফ্রিকায় আজকের মত হাসপাতাল ছিল না, এই হিসাব দিয়ে একটা আনুপাতিক হিসাব বের করা যেতে পারে যে, একজন খোজা তৈরি করতে কি পরিমান শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হত?!? তাও এই হিসাব বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে। মধ্যযুগের হিসাবটা নিজে নিজে এক বার কল্পনা করুন।


আবিসিনিয়ার কুখ্যাত রাজা জন এর আমলে হিকস পাশার ইঙ্গ মিশরীয় সৈন্যবাহিনী থেকে একশ সুদানী সৈন্যকে ধরে খোজা বানিয়ে পাঠানো হয়েছিল খার্তুমে। উপহারের সাথে ছোট্ট একটা বার্তা পাঠানো হয়েছিল,  "মহামান্য সম্রাট যদি কিছু মনে না করে তবে এই সামান্য ডালিটি গ্রহন করতে পারেন"। উপহারের ডালিটি যখন তার নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌছে তখন একশ খোজার মাঝে একজনও জীবিত ছিল না। অতএব প্রতিটা খোজা শুধু জীবন্ত হাহাকার না, প্রতিটা খোজার পেছনে অসংখ্য বিলাপ ও পাশবিকতা ছিল।

মানুষ যে একধরনের পশু তা এই সমস্ত কাহিনী থেকে প্রতীয়মান হয়।


চীনা পদ্ধতিতে শিশুদের খোজা করন:

প্রথমে ব্যক্তিটিকে ঐ কক্ষে নিয়ে একটি কাঠের পাটাতনে শুইয়ে দেয়া হতো। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে যৌনাঙ্গ ও যৌনাঙ্গের আশেপাশের স্থান ধুয়ে নেয়া হতো। এরপর অবশ করতে পারে এমন উপাদানের প্রলেপ দিয়ে যৌনাঙ্গকে অবশ করে ফেলা হতো। তখনকার সময়ে অবশকারী হিসেবে প্রচণ্ড ঝালযুক্ত মরিচ বাটা ব্যবহার করা হতো। 

অতঃপর কয়েকজন মিলে চেপে ধরে উক্ত ব্যক্তির অণ্ডকোষ অথবা অণ্ডকোষ ও লিংগ উভয়ই কেটে দেয়া হতো। এই অবস্থায় প্রচুর রক্তপাত হতো।

এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রোগীকে ঐ কক্ষে তিন দিন রেখে দেয়া হতো। ঐ সময়ে রোগীকে কোনো প্রকার খাবার দেয়া হতো না। এই ধাপ পার হতে পারলে চতুর্থ দিনে রোগীকে প্রস্রাব করতে বলা হতো। যদি প্রস্রাব করতে পারতো তাহলে অপারেশন সফল হয়েছে বলে ধরে নেয়া হতো, আর যদি প্রস্রাব করতে না পারতো তাহলে ধরা হতো এই অপারেশন সফল হয়নি। এক্ষেত্রে রোগী ব্যথা ও ইনফেকশনে মারা যেত।,


বিশেষজ্ঞরা বলেন, অস্বাভাবিক মানুষ গড়তে গিয়ে নিজেদের অজান্তে অনেক সময় সত্যিই অস্বাভাবিক মানুষ গড়ে ফেলছিলেন সেকালের সুলতান, রাজা বাদশাহরা।

হারেম প্রভু সুলতান বা রাজারা তাদের নারী মহলে সুন্দরীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে এই সব পুরষত্বহীন পুরুষদের নিয়োগ দিতেন, এদের হাহাকার নিয়ে কোন কালজয়ী লেখা কেউই লিখে নাই, কে জানে পুরুষ হয়ে এই সব নপুংশকদের নিয়ে লেখায় হয়ত শিভালরি নেই, কিন্তু এদের হাহাকার ইতিহাসের পাতা দিয়ে কিভাবে মোছা যাবে?

Comments

Popular posts from this blog

সময়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে ইসলামের ধরন-ধারণ, প্রচার-প্রচারণা ও প্রয়োগিক পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না ?

 সময়ের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন হতে পারে বলে আমার অনেক শিক্ষিত বন্ধুরা মনে করে থাকেন, এবিষয়ে আমার জানা ইসলামের আলোকে একান্ত বেক্তিগত মতামত~           আপনি বা আপনারা যদি ইসলামকে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ প্রদত্ত ধর্ম বলে বিশ্বাস করে থাকেন ; তাহলে আপনাদের এই ধারণা আল্লাহকে বা সৃষ্টিকর্তাকে ছোট বা খাটো করার নামান্তর। কারণ আল্লাহ এমন একটি সত্তা, যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির শুরু থেকে কেয়ামত বা ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত যা যা ঘটবে, বিজ্ঞানের উন্নতির কারণে যেসব প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আসবে, সে-সব কিছুই তিনি অবগত ছিলেন এবং আছেন। কাজেই সময়ের সাথে বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে যদি ইসলামের ধরন/ধারণ, প্রচার/প্রচারণা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ মনে করতেন, তাহলে উনি উনার বার্তাবাহক অর্থাৎ রাসূল মুহম্মদ সা: মারফত তা জানিয়ে দিতেন। উনি ভবিষ্যতের যেসব বিষয়ে মানুষকে অবহিত করার প্রয়োজন মনে করেছেন, মুহম্মদ সা: এর মাধ্যমে তা জানিয়ে দি...

মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?

 মনের অজান্তেই আমরা গালি দেই কেন ?  ঝগড়ার সময় একে অপরকে আমরা যে গালিগালাজ করি এটা সেরকম কিছু নয়।  ধরুন, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ বেখেয়ালে আপনি একটা তীব্র হোঁচট খেলেন। তখন কী হয়? তীব্র যন্ত্রণাবোধের সাথে সাথেই মুখ থেকেও বেরিয়ে আসে একটা গালি(তোর মায়েরে বাপ~~জাতীয়) অথবা কাপ থেকে হঠাৎ পড়ে গেল কফি বা চা, বারোটা বেজে গেল আপনার জামাকাপড় বা মেঝের এবং সাথে সাথেই - আমাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো (যাহ শালা~)  অথবা আপনি হয়তো ড্রাইভ করছেন, হটাৎ আরেকটি গাড়ি বিপজ্জনক ভাবে রং সাইড দিয়ে আপনাকে ওভারটেক করলো, সাথে সাথেই আপনার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো~ ~ এজাতীয় পরিস্থিতিতে মানুষ নিজের অজান্তেই গালি দেয়; কিন্তু কেন ? কারণ গালিটা মুখদিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেই প্রায় যাদুমন্ত্রের মতই - আমরা তাৎক্ষণিক একটা আরাম বোধ করি। তবে সবার ক্ষেত্রেই - এক রকম হবে, তা কিন্তু নয়। কেউ বেশি গালাগালি করে, কেউ বা কম। আবার অতিমাত্রায় খুশি হলেও মানুষ গালি দেয়, এমন লোকও আছে। কিন্তু একথা সত্যি যে, এহেন পরিস্থিতিতে সব ভাষায়, সব সংস্কৃতিতেই মানুষ গালি দেয়~ গালির সংজ্ঞা কী? "গালি জিনিসটা আসলে ঠিক কি, তা নি...

ইসলাম এবং জঙ্গিবাদ

জানতে ইচ্ছে করে~ উপলক্ষ্য; ড: মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা। ক্ষুদ্র জ্ঞানে ইসলাম সম্পর্কে যতটুকু জানি তা হলো~ জনাব মুহাম্মদ সা: এর জীবনাচরণ-ই হলো ইসলাম। উনি যা করে দেখিয়েছেন, যা বলে গেছেন, তার নামই ইসলাম। পবিত্র কুরআন হচ্ছে ইসলামের সর্বোচ্চ পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ, এরপর হাদিসের গ্রন্থ সমূহের অবস্থান। পবিত্র কোরআন এর অনেক কিছুই সাধারণ মানুষের জন্য বুঝতে পারাটা বেশ কঠিন বিধায়; বড় বড় ইসলামী দার্শনিক-গণ মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন।  উনাদের মতে পবিত্র কোরআন যদি থিওরি হয়, তাহলে মহানবী মুহাম্মদ সা: এর পুরো জীবনটাই হচ্ছে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ।  অর্থাৎ পবিত্র কোরআন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত্ব মতবাদ; আর মুহম্মদ সা: হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তার পাঠানো মডেল, যাকে তিনি পুরোটা জীবন পবিত্র কোরআন অনুযায়ী জীবনযাপন করিয়েছেন শুধুমাত্র মানব-জাতিকে শিক্ষা দেয়ার উদ্যেশ্যে ~ বলাহয়, মানব জাতির জন্য এমন কোন বিপদ/আপদ, বালা/মসিবত এবং সমস্যা আসবে না; যার সম্মুখীন মুহম্মদ স:-কে করা হয়নি~ অর্থাৎ চাইলেই মানুষ তার জীবনের যেকোন সমস্যায় বা পরিস্থিতিতে মুহম্মদ সা: এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে উক্ত সমস্...