রাশিয়া~ইউক্রেন যুদ্ধ নয়; বরং ন্যাটো ও রাশিয়া সমর্থিত দেশগুলির অর্থনৈতিক যুদ্ধের খবরাখবর~
যেখানে কোয়ান্টিটি নয়; বরং কোয়ালিটি অর্থনৈতিক যুদ্ধের ফলাফলের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে ।
আমরা জানি, আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার উপর ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করেছে, উদ্যেশ্য রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু করে দেয়া, নতজানু রাষ্ট্রে পরিণত করা।
যুদ্ধ তো দূরের কথা, জীবিকা নির্বাহের জন্যও যেন পরগাছার মত অন্য রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় রাশিয়াকে, মূলতঃ এই উদ্যেশ্যে-ই উস্কানি দিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে এই যুদ্ধে জড়ানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাশিয়ার উপর চাপানো হয়েছে এই অর্থনৈতিক অবরোধ।
প্রথমদিকে রাশিয়ার অর্থনীতির নিম্নগতি'র কারণে পশ্চিমা বিশ্ব উৎফুল্ল হলেও, পুতিনের পাল্টা কিছু পদক্ষেপের কারণে বিষয়টি "হিতে বিপরীত হওয়ার উপক্রম হয়েছে", বিশেষ করে ইউরোপকে রুবলের বিনিময়ে তেল/গ্যাস ক্রয়ের পুতিনের আল্টিমেটাম~ বিষয়টিকে বুমেরাং হিসেবে ইউরোপ-আমেরিকার দিকেই ফিরিয়ে দিয়েছে ।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, চীন ও ভারত সহ এশিয়ার অনেক দেশের প্রকাশ্য বা গোপনে রাশিয়া-পন্থী কার্যক্রম-ও বিষয়টিকে ইউরোপ/আমেরিকার জন্য বুমেরাং হতে সহায়তা করে যাচ্ছে।
বর্তমানে ডলারের বিপরীতে রুবলের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুদ্ধপূর্ববর্তি সময়ের চাইতে যুদ্ধকালীন সময়ে রাশিয়ার উদ্বৃত্ত বাণিজ্যের কারণে, পুতিন তার অর্থনৈতিক মেকানিজমে'র উপর বেশ আস্থাবান বলেই মনে হচ্ছে,~
হয়ত সেই কারণেই পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েও অন্য আরও কয়েকটি দেশে গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিতে পারছে পুতিন~
বিশ্লেষক গণ মনে করছেন যে, রাশিয়া তার মজবুত অর্থনীতির কারণেই এই দুই দেশে গ্যাস সাপ্লাই বন্ধ করার সাহস করতে পেরেছে, সেই সাথে রাশিয়া দেখতে চাচ্ছে যে এই গ্যাস বন্ধের কারণে ইউরোপে কি প্রতিক্রিয়া হয় এবং তার নিজেরও কতটুকু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লাভ/ক্ষতি হয় ?
রাশিয়ার লাভ ও ক্ষতির বিষয়টি হয়তো কয়েক দিন পরে বোঝা যাবে, তবে পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ায় গ্যাসের দাম যে সাপ্লাই বন্ধের প্রথম দিনেই 20 শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেটি মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সকলেই জানি।
ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলো অবশ্য পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়া-কে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আশার বাণী শোনানো এই দেশগুলি তাদের রিজার্ভ থেকে পোল্যান্ড এবং বুলগেরিয়ার গ্যাসের চাহিদা কতটুকু পূরণ করতে পারবে, যেখানে তাদেরকেই চলতে হয় রাশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য হতে ক্রয় করা গ্যাসের সাহায্যে ? নিজেকে অভুক্ত রেখে কে কয়দিন কাকে খাওয়াতে পারে ?
অবশ্য আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপের দেশ গুলিকে চাপ দিয়ে যাচ্ছে যাতে তারা রাশিয়ার কাছে মাথা-নত না করে, রাশিয়া থেকে রুবলের বিনিময়ে তেল-গ্যাস না কেনে।
কারণ এতে ৩ দিকথেকে লসে পড়বে আমেরিকা~
১.
এর ফলে রাশিয়ার উপর আরোপিত অবরোধ শিথিল হয়ে যাবে,
২.
অন্যদিকে রাশিয়ান মুদ্রা রুবেলের মান দিনকে দিন আরো শক্তিশালী হবে, এবং
৩.
বিশ্ব-বাণিজ্যে বিনিময়-মুদ্রা হিসেবে পেট্রো-ডলারের আধিপত্য খর্ব হবে ও পেট্রো-রুবলের যাত্রা শুরু হবে।
একথা অনস্বীকার্য যে, পুরো ইউরোপ যদি রাশিয়া থেকে রুবলের বিনিময় তেল/গ্যাস ও কয়লা কিনতে বাধ্য হয়, তাহলে বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য অনেকাংশেই ক্ষুন্ন হবে। সেই সাথে যদি চীন ও ভারত রাশিয়ার সাথে ডলার এর পরিবর্তে নিজ নিজ মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু করে, তাহলে বিশ্ব-বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য অর্ধেকেরও নিচে নেমে আসবে বলেই বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন।
অতিসম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার রুবেলের বিনিময়ে রাশিয়া থেকে তেল কেনার ঘোষণা আমেরিকাকে আরও শঙ্কিত করে তুলেছে।
কিন্তু ইউরোপ কি আমেরিকার চাপে রাশিয়া থেকে রুবলের বিনিময়ে তেল/গ্যাস কেনা থেকে বিরত থাকবে ?
আমরা জানি অলরেডি ১০ টি দেশ রাশিয়া থেকে রুবলে তেল/গ্যাস ক্রয় করতে রাশিয়ান গ্যাসপ্রম কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং সম্প্রতি জার্মানি ও ফ্রান্স রুবেলের বিনিময়ে রাশিয়া থেকে তেল গ্যাস কিনতে রাজি বলে ঘোষণা দিয়েছে।
এককথায় ইউরোপের এতদিনের হুমকি-ধামকি যে ফাঁকা বুলি ছিল তা প্রমাণ হতে চলেছে এবং ইউরোপ পুতিন বা রাশিয়ার হাতে জিম্মি হতে চলেছে।
ইউরোপের তেল-গ্যাস ও কয়লার ওপর রিসার্চ করা একটি সংস্থা কয়েকদিন আগে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখানো হয়েছে যে রাশিয়া গত দুই মাসে 63 বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তেল গ্যাস বিক্রি করেছে, যার ৭১% ক্রয় করেছে ইউরোপ, যার মূল্যমান ৪০ বিলিয়ন ইউরো এর সমপরিমাণ।
সংস্থাটির তথ্য মতে যুদ্ধ শুরুর পর গত দুইমাস রাশিয়ার কয়লা বিক্রি বেড়েছে ২০%, এলএনজি বিক্রি বেড়েছে ৫০%, এমন কি পাইপের মাধ্যমে ইউরোপে গ্যাস বিক্রি বেড়েছে ১০%। ইউরোপের এই বর্ধিত পরিমাণ জ্বালানি ক্রয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি করা।
এছাড়াও ইউরোপের বাহিরে রাশিয়ার তেল সাপ্লাই বেড়েছে ২০% কয়লা সাপ্লাই বেড়েছে ৩০% এবং এলএনজি সাপ্লাই বেড়েছে ৮০% যা সাধারণত জাহাজে পরিবহন করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
বলাই বাহুল্য যে ইউরোপের বাহিরে রাশিয়ার এই উদ্বৃত্ত বাণিজ্য হয়েছে মূলতঃ চীন ও ভারত সহ এশিয়ার দেশগুলির কারণে।
এখন সভাবতোই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আমেরিকার সাথে এতগুলো দেশ থাকা সত্বেও রাশিয়া মাত্র কয়েকটি দেশকে সঙ্গে করে এই অসাধ্য কেমনে সাধন করে চলেছে ?
উত্তরটি আমার attached করা পিক এর মধ্যে রেয়েছে, যেখানে একটি গাড়ি শতাধিক টায়ার বহন করা সত্বেও নিজের টায়ার পাঞ্চার হওয়ার কারণে আর সামনে এগুতে পারছে না। এখানে বহন করা টায়ারগুলি পরিমাণে অধিক হলেও সবগুলিই অকেজো, গাড়িটি সচল রাখতে দরকার ছিল মাত্র ২/১ টি সচল টায়ার, যা গাড়িটির বহন করা টায়ার গুলির মধ্যে নেই।
তেমনই আমেরিকার সাথে থাকা দেশগুলোর অধিকাংশই অকেজো/দুর্বল ও পরনির্ভরশীল দেশ, যাদের আমেরিকার চাকায় হওয়া দেওয়ার ক্ষমতা নেই; পক্ষান্তরে সংখ্যায় কম হলেও রাশিয়ার পাশে থাকা দেশ সমূহ যেমন: চীন, ভারত, ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি ও আরব আমিরাত এর মত দেশগুলির রাশিয়ার চাকায় হওয়া দেওয়ার মত যথেষ্ট সক্ষমতা আছে।
কোয়ান্টিটি নয়; বরং কোয়ালিটিই এখানে অর্থনৈতিক যুদ্ধের ফলাফলের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে~
~আজিজ মিশির সেলিম~
Comments
Post a Comment