শেষমেষ পাকিস্তানও কি শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটছে ??
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়াতেই করোনা এবং যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে সবথেকে বেশি। শ্রীলংকার পর নেপাল ও পাকিস্তান প্রায় একই পথে হাঁটছে~
তবে পাকিস্তান নেপালের চাইতেও দ্রুতগতিতে দিন-কে-দিন অবনতির দিকেই যাচ্ছে~
অবশ্য আমি ব্যাক্তিগত ভাবে এই দেশগুলির এহেন অবস্থার জন্য করোনা ও যুদ্ধের চাইতে দুর্নীতিবাজ শাসক এবং দুর্নীতি পরায়ন রাজনৈতিক দলগুলোকেই বেশি দায়ী মনে করি।
যাই হোক; কে দায়ী বা কে দায়ী নয় ? এই বিষয়গুলোতে আলোচনায় না গিয়ে আজকে শুধু পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করব~
বর্তমানে পাকিস্তানের রিজার্ভে যে বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিত আছে, তা দিয়ে আগামী এক দেড় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। কাজেই দেশটি হন্যে হয়ে ঋণদাতাদের পিছনে ছুটছে, তবে অতীতে ঋণ পরিশোধে দেশটির রেকর্ড খুব একটা ভালো নয় বলে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো থেকে ঋণ পাওয়াটা পাকিস্তানের জন্য একটু কঠিনই হবে বলে বোদ্ধারা মনে করেন।
এখন শ্রীলংকার সাথে তাল মিলিয়ে পাকিস্তানের অর্থনীতির কয়েকটি বিষয় আলোকপাত করছি~
পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন উল্লম্ফন চলছে বর্তমানে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তথ্যমতে পাকিস্থানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি 11%, যা এশিয়ার মধ্যে শ্রীলংকার পরেই সর্বোচ্চ । আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই মূল্যস্ফীতি 15% এ গিয়ে ঠেকতে পারে বলে অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন। অবশ্য শ্রীলংকার বর্তমান মূল্যস্ফীতি 21% ।
পাকিস্তানের এই মূল্যস্ফীতির পিছনে বৈশ্বিক জ্বালানি এবং অভ্যন্তরীণ খাদ্যপণ্যের বাজারের অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। দেশটির আমদানি ব্যয়ের 20% শতাংশ ব্যয় করতে হয় বিদেশ থেকে জ্বালানি পণ্য সংগ্রহের পিছনে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এই মূল্যষ্ফীতির লাগাম টানতে না পারে তাহলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের অবস্থা শ্রীলংকার কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
জ্বালানি সাপ্লাই না থাকার কারণে পাকিস্তানের অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রই বর্তমানে বন্ধ আছে, অনেকটা শ্রীলংকার মতই দেশটিতে স্থানভেদে 8 থেকে 18 ঘন্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে কয়লা ও এলএনজি সহ জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র গুলোতে জ্বালানি সরবরাহ করা এখন অনেকটাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ এর চাহিদা 25 হাজার মেগাওয়াটের উপরে হলেও উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ 18 হাজার মেগাওয়াটের মত।
দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা 36 হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন করতে পারছে মাত্র অর্ধেকের মত।
পাকিস্তানের এক্সপোর্ট এর চাইতে ইমপোর্ট এর পরিমাণ বেশি অর্থাৎ বেচাবিক্রি চাইতে কিনতে হয় বেশি, এ কারণে ডলার পাকিস্তানের ঢোকার চাইতে বেরিয়ে যাচ্ছে বেশি, ফলশ্রুতিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কে বারবার ডলারের বিপরীতে পাকিস্তানি রুপির মানের অবমূল্যায়ন করতে হচ্ছে। বর্তমানে 1ডলারের পরিবর্তে 189 রুপি গুনতে হচ্ছে পাকিস্তানকে । চলতি অর্থবছরে পাকিস্তানি রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় 20% ।
দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুতগতিতে কমে আসছে, গত এক মাসে এই রিজার্ভ কমেছে প্রায় 5 বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে পাকিস্তানের রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র 11 বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের দেড় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকগণ।
গত অর্থবছরে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি ছিল 5.6 % , অধুনালুপ্ত ইমরান খানের সরকার ঠিক করেছিলেন যে বর্তমান অর্থবছরে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে 6%, পরে পুনঃ সংশোধনীর মাধ্যমে তা পুনরায় নির্ধারণ করেন 4.8% । কিন্তু এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বলছে বর্তমান অর্থবছরে পাকিস্তানের এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করাও সম্ভব নয়, প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে 4 শতাংশের নিচে।
পাকিস্তানের বর্তমান শাহবাজ সরকার শ্রীলংকার মতই আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। শাহবজ সরকার যেহেতু আমেরিকার মদদপুষ্ট সরকার, কাজেই আমেরিকার ইঙ্গিতে আগামী এক বছরে বেলআউট কর্মসূচির আওতায় পাকিস্তানকে 800 কোটি মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়েছে আইএমএফ।
পাকিস্তান যদি এই অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে তাহলে হয়তো খাদের কিনারা থেকেও ঘুরে দাঁড়ানোর একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে, তবে পাকিস্তানের দুর্নীতি পরায়ন সরকার ব্যবস্থা, সেনাবাহিনী এবং রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে অর্থের সঠিক ব্যবহার কতটুকু আশা করা যেতে পারে ? বিশ্লেষকদের মতে তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে, সেই কারণেই সন্দেহ আছে পাকিস্তানের ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়ে।
তাহলে পাকিস্তানও কি শ্রীলঙ্কা হতে চলেছে ?
কোন দেশের ঋণের রেশিও যদি ৪০% এর বেশি হয়, তাহলে ধরে নেয়াহয় যে দেশটি দেউলিয়া হওয়ার পথে এগুচ্ছে । বর্তমানে পাকিস্তানের ঋণের রেশিও ৪১% এবং শ্রীলংকার ঋণের রেশিও ১০৪% ।
তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে ??????
Comments
Post a Comment